কিশোরকন্ঠ-সর্বাধিক প্রচারিত শিশু-কিশোর মাসিক এখন এখানেই পড়ুন

 
read kishor kontha

কিশোরকন্ঠ-সর্বাধিক প্রচারিত শিশু-কিশোর মাসিক


  • আমাদের ভাষা আমাদের গর্ব -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ
  • বসন্ত আসে রাজার সাজে -কামরুল আলম
  • রাবার নিয়ে যত কথা -আবদাল মাহবুব কোরেশী
  • এশিয়া কাপ, বিশ্বকাপ বাংলাদেশের বিশ্বজয়ের মিশন -হাসান শরীফ
  • মনের পরিশুদ্ধতাই উজ্জ্বল আলোকিত মানুষ গড়ে তোলে -ছটকু আহমেদ
  • তিন লোভী বন্ধু ও হজরত ঈসা আ: -ইকবাল কবীর মোহন
  • ১০০ টাকা এবং পরাজিত স্বপ্ন -মো: আবদুল বাতেন
  • ত্যাগী এক গভর্নর -আবদুল হালীম খাঁ
  • মেঘ ভাঙা রোদ -আবুল হোসেন আজাদ
  • দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ
  • রত্নদ্বীপের আতঙ্ক -আহমেদ বায়েজীদ
  • স্বপ্নের সাইকেল, দুঃস্বপ্নের চোর! -মাহিন মুবাশশির
  • অভিমান -তোফায়েল সিপু
  • রুমির কান্না -শরিফ আহমাদ
  • পাখি শিকার -ফজলে রাব্বী দ্বীন
  • বাবার সাথে দেখা -শাহিদা বেগম কনা
  • বন্ধুকবি আইনস্টাইনের কথা -দীপ্ত বিপ্লব খান শুভ
  • শ ব্দ ধাঁ ধা
  • বলতে পারো
  • খোলা ডাক
  • হাসির বাকসো
  • অপেক্ষার প্রহর -আশরাফুল ইসলাম
  • কুরআনের আলো
  • গ্রাম বাংলায় শীত -মঈনুল হক চৌধুরী
  • শীতের কথা শীতের ব্যথা -ড. রফিক রইচ
  • বিশুদ্ধভাষী রাসূল সা. -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ্
  • মে ফ্লাই পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষণজীবী প্রাণী -মৃত্যুঞ্জয় রায়
  • নতুন দিগন্তে মোস্তাফিজ -হাসান শরীফ
  • ক্রিস্টোফার কলম্বাস দুর্জেয়কে জয় করার এক ইতিহাস -হুসনে মোবারক
  • দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ
  • রত্নদ্বীপের আতঙ্ক -আহমেদ বায়েজীদ
  • জাতীয় কিশোরকণ্ঠ পাঠ প্রতিযোগিতা ২০১৫ স্বপ্ন দেখতে হবে নতুন পৃথিবী গড়ার
  • ওরা তিনজন মূল গল্প : হযরত ইমাম গায্যালী রহ: -নাট্যরূপ : শেখ আবুল কাশেম মিঠুন
  • প্রতিযোগিতা -ওয়াসিম আকরাম
  • শীতের ছুটি -শাহাদত শাহেদ
  • তিন বন্ধু -রুমান হাফিজ
  • বলতে পারো
  • হাসির বাকসো
  • ছোট আব্বু -শরিফ আহমাদ
  • মোবাইল -সুহৃদ আকবর
  • আরপি ভাইয়া -মেসবাহ কামাল
  • চিরঋণী – মো: আরিফুল ইসলাম
  • শেষ বিকেল -ইব্রাহীম বিন রশীদ
  • কুরআনের আলো
  • বিজয় দিবসের প্রার্থনা -জয়নুল আবেদীন আজাদ
  • আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা) -ইকবাল কবীর মোহন
  • হাওরের প্রকৃতি আবদাল -মাহবুব কোরেশী
  • শীত পর্যটকদের বরণ করতে প্রস্তুত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি মৌলভীবাজার -আবদুল হাই ইদ্রিছী
  • দুর্গম পথের যাত্রী -আসাদ বিন হাফিজ
  • রত্নদ্বীপের আতঙ্ক -আহমেদ বায়েজীদ
ভাষা। ভাব প্রকাশের বাহন। সৃষ্টি জগতের প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব ভাষা আছে। তারা তাদের পরিমন্ডলে স্বকীয় ভাষাতেই মনের ভাব প্রকাশ করে থাকে। এ ভাষা হতে পারে মুখের কিংবা কোন অঙ্গভঙ্গির। যারা কথা বলতে পারে তাদের ভাব প্রকাশের প্রধান মাধ্যমই মুখের ভাষা। আর যারা মূক-বধির বা বাকপ্রতিবন্ধী তারা ভাব প্রকাশ করে অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে। আমরা যারা মুখে কথা বলতে সক্ষম তারা কতই না সৌভাগ্যবান। আমরা মুখেও যেমন উচ্চারণ করি তেমনি অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তা আরো স্পষ্ট করে তুলি। মুখের কথার সাথে সাথে দৈহিক অভিব্যক্তির মাধ্যমে আমরা আমাদের সব চাওয়া-পাওয়ার প্রকাশ ঘটাই। মুখের ভাষা কিংবা মুখে উচ্চারিত অর্থবোধক শব্দকেই মূলত ভাষা বলে আখ্যা দেয়া হয়। তা হতে পারে ধ্বনিভিত্তিক কিংবা লিখিত রূপে। ভাষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তাই বলা হয়ে থাকে ‘ভাষা মানুষের মস্তিষ্কজাত একটি মানসিক ক্ষমতা যা বাকসঙ্কেতে রূপায়িত হয়ে একই সমাজের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে সহায়তা করে।’ সুতরাং ভাষাই মানবিক বন্ধনের অন্যতম প্রধান বাহন।
ভাষা শিক্ষার প্রক্রিয়া
শিশুরা অবুঝ। কিন্তু ওদের নিজেদেরও একটা নিজস্ব বুঝশক্তি আছে। তাইতো শিশুদেরকে জোর করে ভাষা শেখানো লাগে না। যেকোনো মানবভাষার উন্মুক্ত সংস্পর্শে এলেই শিশুরা দ্রুত তা শিখে ফেলতে পারে। শিশুরা কতগুলো নির্দিষ্ট ধাপে ভাষা শেখে। খুব কম বয়সেই ভাষা শেখার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়। চার বা পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই শিশুরা ভাষার সম্পূর্ণ ব্যাকরণ আয়ত্ত করে ফেলে। অর্থাৎ এখানে ব্যাকরণ বলতে স্কুলপাঠ্য ব্যাকরণ বই নয়, ভাষার বাক্যগঠনের অন্তর্নিহিত মানসিক নিয়মগুলো আয়ত্ত করতে পারে। এ থেকে বোঝা যায় যে, শিশুরা ফিতরাত বা প্রকৃতিগতভাবেই ভাষা শিক্ষা ও ব্যবহারের ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় এবং এ ক্ষমতা বিশ্বজনীন ব্যাকরণেরই অংশ। ছোট শিশুদের মধ্যে প্রবৃত্তিগতভাবেই কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে যা তাদেরকে শিশু বয়সেই মাতৃভাষা শিক্ষার উপযোগী করে তোলে। এ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে আছে বাগনালীর গঠন, যার মাধ্যমে শিশু তার মাতৃভাষার বিভিন্ন শব্দ উৎপাদন করে। এ ছাড়া শিশুদের সাধারণ বৈয়াকরণিক মূলনীতিগুলো এবং বাক্যগঠনের স্তরগুলো বোঝার ক্ষমতা থাকে।
শিশুরা কোন নির্দিষ্ট ভাষা শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হয় না। বরং যে ভাষা তাদের আশপাশে বলা হয়, তারা সে ভাষাই শিখে ফেলে, এমনকি যদি তাদের পিতামাতা অন্য কোন ভাষাতে কথা বলে, তা হলেও। শিশুরা একাধিক ভাষা অর্জনে তেমন কোন কষ্টের সম্মুখীন হয় না। কিন্তু বয়ঃসন্ধির পরে দ্বিতীয় কোন ভাষা শিখতে মানুষকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং প্রায়ই সেই ভাষাতে সে উচ্চস্তরের দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। মানুষ যদি দ্বিতীয় ভাষাটি সম্প্রদায়ে ও তাদের সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়, তবেই সে ভাষাটি সবচেয়ে সফলভাবে আয়ত্তে আনতে পারে। এ ছাড়া যে সমস্ত সংস্কৃতিতে দ্বিতীয় ভাষা শেখার ওপর জোর দেয়া হয়, সেখানেও দ্বিতীয় ভাষা অর্জন সহজ হয়। উদাহরণস্বরূপ আফ্রিকার বহু দেশে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ফরাসি অর্জনের ঘটনাকে উল্লেখ করা যায়। মূক-বধির শিশুরা প্রতীকী ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও অনুরূপ দক্ষতা দেখায়। অর্থাৎ ভাষা অর্জনের ক্ষেত্রে ধ্বনি শোনা বা উৎপাদন করা পূর্বশর্ত নয়। প্রতীকী ভাষাগুলো দৃষ্টি ও ইঙ্গিতভিত্তিক হলেও এগুলো কথ্য ভাষার চেয়ে কোন অংশে অনুন্নত বা গাঠনিক দিক থেকে কম জটিল নয়।
ভাষার মিল-অমিল
ভাষার বৈশিষ্ট্য ও বিবিধ ভিন্নতা সত্ত্বেও সব ভাষার শব্দ ও বাক্যগঠনের সূত্রগুলো প্রায় একই ধরনের। সব ভাষাতেই বৈয়াকরণিক ক্যাটাগরি যেমন বিশেষ্য, ক্রিয়া ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়। সব ভাষাতেই পুং বা স্ত্রী ইত্যাদি বিশ্বজনীন আর্থিক বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। সব ভাষাতেই না-বাচকতা, প্রশ্ন করা, আদেশ দেওয়া, অতীত বা ভবিষ্যৎ নির্দেশ করা ইত্যাদির ব্যবস্থা আছে। মানুষের ভাষায় ভাষায় যে পার্থক্য, তার কোনো জৈবিক কারণ নেই। যেকোন সুস্থ স্বাভাবিক মানবশিশু পৃথিবীর যেকোনো ভৌগোলিক, সামাজিক, জাতিগত বা অর্থনৈতিক পরিবেশে যেকোনো ভাষা শিখতে সক্ষম।
সব ভাষাই সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়। ভাষাও মানুষের মতই গতিময়। কখনো ব্যাপক শব্দসম্ভার নিয়ে এগিয়ে যায়। আবার কখনো হারিয়ে ফেলে তার ঐতিহ্য। এভাবে প্রতিনিয়ত ভাষা ও ভাষায় শব্দের ব্যবহার পাল্টে যাচ্ছে। অনেক ভাষা অস্তিত্ব রক্ষায় অন্যের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে নিচ্ছে। যার ফলে খর্ব হচ্ছে ভাষার স্বাতন্ত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। গবেষকদের মতে প্রতি ১৫ দিনের মধ্যে একটি করে ভাষা পৃথিবীর বুক থেকে মুছে যাচ্ছে। জন্মও নিচ্ছে অনুরূপভাবে। তবে এগুলো মৌখিক বা কথ্যভাষা। আবার অনেকগুলো ভাষা আছে যেগুলো একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষই ব্যবহার করতেন। বাস্ক, উস্কারা এ রকম অনেক ভাষাই ব্যবহারের অভাবে শেষ হয়ে গেছে।
বাংলাভাষার বিকাশ ও তার ব্যাপ্তি
বাংলাভাষা দক্ষিণ এশিয়ার বঙ্গ অঞ্চলের স্থানীয় ভাষা। এ অঞ্চলটিকে ঘিরেই বর্তমানে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ নামক আমাদের প্রিয় জন্মভূমিটি প্রতিষ্ঠিত। এ ছাড়াও ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গও এ অংশের স্মৃতিবহন করে। সেইসাথে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকা এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জেও বাংলা ভাষায় কথা বলা হয়। এ ভাষার লিপিরূপ বাংলালিপি। এসব অঞ্চলের প্রায় সর্বত্রই বাংলাভাষা প্রচলিত হওয়ায় এ ভাষা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। এ ভাষাভাষীর লোকসংখ্যা এখন ত্রিশ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত এবং ভারতের জাতীয় স্তোত্র এ ভাষাতেই রচিত। বাংলাদেশের জাতীয় ভাষা ও সরকারি ভাষা বাংলা। এ ছাড়াও ভারতীয় সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত ২৩টি সরকারি ভাষার মধ্যে বাংলা অন্যতম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারি ভাষা বাংলা। এ ছাড়াও ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান ভাষা বাংলা। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলা ভাষা ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের দ্বিতীয় সরকারি ভাষারূপে স্বীকৃত। পাকিস্তানের করাচি শহরে দ্বিতীয় সরকারি ভাষারূপে বাংলাকে গ্রহণ করা হয়েছে। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে সিয়েরা লিওনের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আহমাদ তেজন কাব্বাহ ওই রাষ্ট্রে উপস্থিত জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীর ৫,৩০০ বাংলাদেশী সৈনিকদের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদান করেছেন।
বাংলা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিকাশমান ভাষা হলেও অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্বে বাংলা ব্যাকরণ রচনার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ১৭৩৪ থেকে ১৭৪২ সালের মধ্যে ভাওয়াল জমিদারিতে কর্মরত অবস্থায় পর্তুগিজ মিশনারি পাদরি ম্যানুয়েল দ্য আসুম্পসাও সর্বপ্রথম ‘ভোকাবোলারিও এম ইডিওমা বেঙ্গালা, এ পোর্তুগুয়েজ ডিভিডিডো এম দুয়াস পার্তেস’ নামক বাংলা ভাষার অভিধান ও ব্যাকরণ রচনা করেন। ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড নামক এক ইংরেজ ব্যাকরণবিদবিদ ‘অ্যা গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’ নামক গ্রন্থে একটি আধুনিক বাংলা ব্যাকরণ রচনা করেন, যেখানে ছাপাখানার বাংলা হরফ প্রথম ব্যবহৃত হয়। বাঙালি সমাজসংস্কারক রাজা রামমোহন রায় ১৮৩২ সালে ‘গ্রামার অব্ দ্য বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ্’ নামক একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ রচনা করেন। তারপর থেকে আর থেমে এ নেই এ পথ চলার। আজ হাজারও ব্যাকরণের ভাষা আমাদের বাংলাভাষা। গানের ভাষা আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলাভাষা।
ভাষার গৌরব গৌরবের ভাষা
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত বাংলা ভাষার মধ্যে ব্যবহার, উচ্চারণ ও ধ্বনিতত্ত্বের সামান্য পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে বাংলা ও তার বিভিন্ন উপভাষা বাংলাদেশের প্রধান ভাষা এবং ভারতে দ্বিতীয় সর্বাধিক প্রচলিত ভাষা। বাংলা ভাষা আন্দোলনের কারণে বাংলাদেশে এ ভাষার সমৃদ্ধি অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৫১-৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত বাংলা ভাষা আন্দোলন এই ভাষার সাথে বাঙালি অস্তিত্বের যোগসূত্র স্থাপন করেছিল। ‘পলাশ ফুলে শিমুল ফুলে স্বপ্নফুলে আগুন/ ভাষার মিছিল/ আশার মিছিল/ দেয় জাগিয়ে রক্তঝরা টগবগে লাল ফাগুন।’ ফাগুনের এ মিষ্টি রোদেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে শাণিত হয়েছিল অধিকার আদায়ের সংঘবদ্ধ শ্লোগান। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একগুঁয়েমি আচরণের সমুচিত জবাব দিতেই রাজপথ শিমুল-পলাশের রঙে রঞ্জিত করেছে, ঢেলে দিয়েছে বুকের তাজা খুন। শহীদ সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অসংখ্য জীবন্তশহীদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আমাদের স্বকীয়তা ফিরে পেতে সক্ষম হয়েছিলাম। এ ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই আমাদের স্বাধীনতা, আমাদের বিজয়, আমাদের প্রিয় স্বাধীন বাংলাদেশ। এ কথাও উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশ ছাড়াও ১৯৫০-এর দশকে ভারতের বিহার রাজ্যের মানভূম জেলায় বাংলা ভাষা আন্দোলন ঘটে। ১৯৬১ সালে ভারতের আসাম রাজ্যের বরাক উপত্যকায় একইরকমভাবে বাংলা ভাষা আন্দোলন সংঘটিত হয়। তবে ভাষার জন্য প্রাণ দেয়ার নজির বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোন অঞ্চলের মানুষের নেই। মাতৃভাষার জন্য তাঁদের জীবনদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারির এ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।
জন্মগতভাবে মায়ের কোল থেকে যে ভাষা শেখা হয় তার মায়াই আলাদা। একান্ত আপনজনকে ‘মা’ বলে সম্বোধন করার সুযোগ এ ভাষা থেকেই পেয়েছি। এ ভাষার লালনে সুলতানি ও মোগল আমলের মুসলিম শাসকদেরও রয়েছে অনন্য পৃষ্ঠপোষকতার গৌরব। কোন দুষ্টুচক্রের কথায় আমরা আমাদের এ ঐতিহ্যকে হারাতে দিতে পারি না। তাইতো আমাদের ফুঁসে ওঠা, আমাদের আন্দোলন, আমাদের রক্তঢালার প্রতিযোগিতা। উনিশ শ’ বায়ান্ন সালে ভাষার অধিকার আদায়ে আমরা বিজয়ী হয়েছি। তখনও প্রমাণিত হয়েছে, জোর করে কোন মতকে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া যায় না। বাংলাদেশের স্বাধীনচেতা মানুষ স্বকীয় আদর্শ নিয়েই বেঁচে থাকতে পছন্দ করে এবং তা করেই ছাড়ে। বায়ান্ন থেকে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের যে অধিকার আমরা আদায় করেছি, নিজের ভাষাচর্চার যে স্বাধীনতা পেয়েছি সে পথ ধরেই এগিয়ে যেতে চাই আজীবন। ধাপে ধাপে সমৃদ্ধ করতে চাই আমাদের প্রিয় বাংলাভাষাকে।
শেষকথা
এতো অর্জনের মাঝেও নিরাশার কালো মেঘ মাঝে মধ্যেই দানা বাঁধে মনের আকাশে। সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নামে হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে যে ভাষাগত-সাংস্কৃতিক কালোথাবা আমাদের ওপর পড়েছে তা উদ্ধারের কোন বিকল্প নেই। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এ থাবায় অনেকাংশেই পঙ্গু হয়ে গেছে। সেখানকার শিশুরা এখন আর বাংলাভাষা বলতেই পারে না বলা চলে। অফিসার থেকে শুরু করে মুদি দোকানদাররা পর্যন্ত সে জালেই বন্দি হয়ে পড়েছে। তাদের মুখে হয়তো হিন্দি নতুবা ইংরেজি। বাংলাভাষার জন্য এখন সম্ভাবনার পথ উন্মুক্ত করতে পারে একমাত্র বাংলাদেশই। সে বাংলাদেশে যেভাবে ডোরেমন, মটু-পাতলুর আগ্রাসন চলছে তাতে শিশুরা যেমন বাংলার চেয়ে হিন্দিতেই বেশি পারদর্শী হয়ে পড়েছে তেমনি হিন্দি গান ও সিনেমার কবলে বাংলাদেশের যুবসমাজও আটকে গেছে বলা চলে। হিন্দি ও পশ্চিম বাংলার সিরিয়ালে নারীদের মনমস্তিষ্ক আটকে যাবার কারণে পরবর্তী প্রজন্ম তাদের কাছে ঐতিহ্যের কোন শিক্ষা পাচ্ছে না। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং নিরাশার কালো অধ্যায়। সেইসাথে বাংলাদেশে অভিজাত পল্লীতে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর দৌরাত্ম্যে বাংলা ভাষা এখন কোণঠাসা হতে শুরু করেছে। তাই আগামীতে বাংলাভাষার সমৃদ্ধি ও সম্প্রসারণে শুধু নয় বাংলাভাষা রক্ষার জন্যও যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। এ জন্য চাই মনস্তাত্ত্বিক স্বাধীনতা; নিজেদের স্বকীয়তা এবং প্রকৃতভাবে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আর নতুন প্রজন্মকে হতে হবে ভাষা রক্ষার সংগ্রামে দায়িত্ববান সিপাহসালার।

বছর ঘুরে আবার এলো বসন্ত। বসন্ত মানে ঋতুর রাজা। নিশ্চয়ই তোমাদের মনে প্রশ্ন জাগছে বসন্তকে ঋতুর রাজা বলা হয় কেন? হ্যাঁ, রাজাই বটে। বসন্তকালে বাংলাদেশের প্রকৃতিটা রাজকীয় রূপে সাজে। কনকনে ঠান্ডা ঋতু শীতের পরেই আগমন ঘটে বসন্তের। তোমরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছো শীতকালে গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়ে। গাছগাছালির দিকে তাকালে কেমন যেন মরা মরা ভাব লক্ষ্য করা যায়। সেই মরা ভাবটা কাটাতেই বসন্ত আসে। গাছে নতুন পাতা গজায়, সবুজে সবুজে ছেয়ে যায় চারদিক। নানা রঙের ফুলে ফুলে ভরে ওঠে গাছগাছালি। পাখিরা গান গায় মনের আনন্দে। কোকিলের কুহু কুহু গানে নেচে ওঠে কবিমন। তাইতো মনের আনন্দে ছড়াকার ছড়া কাটেন এভাবেÑ
‘‘বসন্তকাল যখন আসে
মন চলে যায় দূরে
কুহু কুহু কোকিল যেথায়
ডাকে মধুর সুরে।’’
এই যে এত আনন্দ। এত এত ফুলপাখিদের মেলা বসে যে ঋতুতে, সেটাই তো আমাদের সবার চেনা ঋতুরাজ বসন্ত। আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ ছয়টি ঋতুর দেশ। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতি দুই মাসে এক একটি ঋতু হয়। সে হিসেবে ফাল্গুন ও চৈত্র এ দুই মাসকে বসন্তকাল বলে। অবশ্য ঋতুর এ প্রকারভেদ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে ছয়টি ঋতু নেই। অবাক হচ্ছো বন্ধুরা! অবাক হবারই কথা বটে। আমাদের দেশে যেখানে ছয় ঋতু, সেখানে অন্যান্য দেশে মাত্র তিনটি ঋতু! প্রকৃতিও ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্নভাবে সাজে। যেমন ধরো রাশিয়ায় শীতকালে বৃষ্টি হয়। ঠিক আমাদের বিপরীত, তাই না? সেসব দেশে বৃষ্টি থেকে বরফ জমে প্রকৃতিটা এত বেশি ঠান্ডা হয় যে পাখিরা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে না। তাই তো তারা দলবেঁধে ছুটে যায় অন্যত্র। আসে আমাদের দেশেও। এবার মিলে গেল তো? ভাবছিলে বুঝি ভাইয়া বানিয়ে বানিয়ে বলছে। শীতকালে আবার বৃষ্টি হবে কিভাবে? আল্লাহতায়ালা এই আকাশ ও পৃথিবীসহ সবকিছুই সৃষ্টি করেছেন। তিনিই সাজিয়ে দিয়েছেন প্রকৃতির এই অপরূপ সাজ। একবার চিন্তা করে দেখ তো ইয়া লম্বা নারকেল গাছের মাথায় ছোট ছোট ডাব বা নারকেলের ভেতরে পানযোগ্য সুমিষ্ট পানি কোথা থেকে আসে? এটা কিভাবে সম্ভব হয়? যে আল্লাহ এত নিখুঁতভাবে এসব সাজিয়েছেন তাঁর জন্য শীতকালে বৃষ্টি দেওয়াটা কোনো ব্যাপারই না।
বসন্তের প্রথম দিনে বলা হয়ে থাকে ফুল ফুটুক আর না-ই ফুটুক আজ বসন্ত। কারণ বসন্ত হচ্ছে ফুল ফোটার কাল। বসন্তকালে নানা রঙের ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় গাছগাছালি। লাল ফুল, নীল ফুল, হলুদ ফুল, গোলাপি ফুল, বেগুনি ফুল, ঘিয়ে ফুল, আকাশি ফুল, কমলা ফুল, সাদা ফুলসহ কত নাম না জানা বাহারি রঙের ফুল ফোটে বসন্তে। বসন্তের ফুল মানেই রঙের মেলা। যেমন ধরো টকটকে লাল শিমুল ফুল। বসন্তের ফুল হিসেবে পরিচিত হলেও শীতের শেষ দিকেই চলে আসে গাছের ডালে ডালে। শিমুল কেবল মানুষকে নয়, পাখিদেরও আকৃষ্ট করে দারুণভাবে। বনের আগুন নামে পরিচিত পলাশ ফুলও বসন্তের ফুল হিসেবে পরিচিত। নজরকাড়া এ ফুলটি গাছের শাখায় শাখায় ধরিয়ে দেয় কমলা রঙের আগুন! গাঁদা ফুলের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায় ঋতুরাজ বসন্তে। হলুদ, সাদা, সোনালি ও মেরুনসহ নানা রঙের গাঁদা ফুল থাকলেও আমাদের দেশে কেবল হলুদ ও কমলা রঙের গাঁদা ফুলই বেশি দেখা যায়। বসন্তকাল এলে বাগানে বাগানে হরেক রঙের ডালিয়া ফুল বাড়ির চিত্রটাকেই পাল্টে দেয়। শীতের মাঝামাঝিতে ফোটে চন্দ্রমল্লিকা ফুল যা বসন্তের রূপকে সজ্জিত করে তোলে। কৃষ্ণচূড়া, মাধবীলতা, সন্ধ্যামালতিসহ নানান ফুলে সত্যি প্রকৃতিটা সাজে রাজার সাজে। চাঁপা ফুলও বসন্তকালেই বেশি ফোটে। এ সময় কাঁঠালি চাঁপার সুবাসে ভরে ওঠে বাংলাদেশের বাতাস। বিশেষ করে রাতের বেলায় ফুলটি সুগন্ধ ছড়ায়। কাঁঠালি চাঁপার রঙেরও একটি মজা আছে। ফুলটি প্রথমে সবুজ থাকে। পরে হলুদ রঙ ধারণ করে। হলদে হবার পর ফুলটি থেকে সুগন্ধও বের হয়। গাছের ডালের মাথায় থোকায় থোকায় দোলনচাঁপা দেখা যায় বসন্তের ভর দুপুরে।
বসন্তকালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনকে প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যায়। গুনগুনিয়ে গান পর্যন্ত গায় অনেকেই। আমগাছে বোল আসে বসন্তেই। লিচু গাছগুলোও ফলবতী হয়ে ওঠে এ সময়। যব, গম, সরিষা ইত্যাদি শস্যে মাঠে মাঠে ছড়ায় নতুন শোভা। বাংলাদেশের প্রকৃতি বৈচিত্র্যময়। প্রতিটি ঋতুরই সৌন্দর্য আছে। কিন্তু বসন্তের প্রকৃতি সত্যি উপমাহীন। তাইতো বসন্তকে বলা হয় ঋতুর রাজা। প্রিয় কবি মোশাররফ হোসেন খানের একটি কবিতায় বসন্তকাল চিত্রিত হয়েছে এভাবে-
“গাছে গাছে কি যে শোভা আমের মুকুল
বসন্তের রঙে সাজে নদীর দু’কূল।
রাত আরও গভীর হলে পরীদের ডানায়
ভরে ওঠে পদ্মপুকুর কানায় কানায়।
পিক-পাপিয়া ডাকে পাখি সকাল দুপুর
রানীর বেশে নামলো সে দু’পায়ে নূপুর।
নূপুরের বাজনা শুনে সুদূরের মাঠ
জেগে ওঠে ঝিঁঝিদের জোছনার হাট।
রাত পোহালে ফরসা হলে আচানক ভোর
রাজপুত আলতো করে দেয় খুলে দোর।
বাসন ভরা পিঠাপুলি দারুণ পাপর ভাজা
ঘোড়ায় চড়ে দখিন হাওয়ায় আসে ঋতুর রাজা ॥”
শীতকালে যেমন শীতের বুড়ির সন্ধান পাওয়া যায়, বসন্তে তেমন কোন কাল্পনিক চরিত্রকে খুঁজতে হয় না। অবশ্য বসন্তের প্রথম মাস ফাল্গুনে শীত শীত ভাব থেকে যায়। এ মাসে শীতের পোশাক শরীর থেকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়া যায় না। ধীরে ধীরে শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ফুলে ফুলে সেজে ওঠে বসন্ত। তাই তো কবি বলেনÑ
‘‘শীত চলে শীত চলে যায়
বসন্তকাল আসে
ফুল পাখি আর প্রজাপতি
বসন্তে খুব হাসে।
কৃষ্ণচূড়া পলাশ শিমুল
ফোটে গাছের ডালে
শুকনো ডালে সবুজ পাতা
গজায় নতুন তালে।
বসন্তে যে আমের মুকুল
নতুন করে ফোটে
গুনগুনিয়ে গান ধরে যায়
রাখাল ছেলের ঠোঁটে।
কুহু কুহু কুহু কুহু
গায় কোকিলে গান
ঋতুর রাজা বসন্তটা
আল্লাহতায়ালার দান।’’
বনে বনে প্রজাপতি খেলা করে, কোকিল ডাকে কুহু কুহু গান। বসন্তের আগমনে মানুষের মনেও প্রকৃতির মতোই যেন পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। প্রকৃতি ধারণ করে রূপ-লাবণ্যে ভরা মনোহর পরিবেশ আর মানুষের মনে জাগে আনন্দের জোয়ার। শীতের রিক্ততা ভুলিয়ে আগুনঝরা ফাগুন নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবন রাঙাতে বসন্ত আসে। বসন্ত আসে রাজার সাজে।
রাবার চেনে না, জানে না এমন মানুষ কি পৃথিবীতে কেউ আছে? আমাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনে এবং আধুনিক সভ্যতা বিকাশে রাবারের ব্যবহার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বন্ধুরা, তোমরা কি জানো? রাবার জিনিসটা আসলে কী? কোত্থেকে এর জন্ম? কিভাবে রাবার তৈরি করা হয়? সত্যি কথা বলতে কি জানো-রাবার জিনিসটা হলো মহান স্রষ্টার সৃষ্টির এক আশ্চর্য নেয়ামত। পৃথিবীর মানুষ বিভিন্নভাবে রাবারকে কাজে লাগিয়ে তোমাদের খেলার সামগ্রী থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রায় ৪৬ হাজার পণ্যসামগ্রী তৈরি করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করছে। এবং তাতে আয় করছে কোটি কোটি বৈদেশিক মুদ্রা। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাড়ছে রাবার চাষের ব্যাপকতা। বিশেষ করে ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ আরো অনেক দেশে ব্যাপক হারে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে রাবারের চাষ। সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশ বাংলাদেশও পিছিয়ে নয়। অর্থকরী ফসল হিসেবে বাংলাদেশ সরকার রাবার চাষের ব্যাপকতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বন্ধুরা, আজ তোমাদের বলবো রাবার কী জিনিস? রাবার কোথা থেকে এবং কিভাবে সংগ্রহ করা হয় এবং রাবার চাষের গুরুত্বই-বা কি। অর্থাৎ রাবারের সার্বিক বিষয় নিয়ে মোটামুটি আলোচনা রাখতে চাই। তোমরা তৈরি আছো তো?
রাবারের ইতিবৃত্ত-উদ্ভিদ জগতের বিস্ময়কর নাম আর প্রকৃতির এক আশ্চর্য সৃষ্টি মহামূল্যবান রাবার গাছ। উঁচু উঁচু পাহাড়-টিলা এবং সমতল ভূমিতে প্রায় ২০-২৫ ফুট লম্বা এ গাছগুলো সারিবদ্ধভাবে লাগানো থাকে যা দেখলেই মন ভরে ওঠে। একটি রাবার গাছ সাধারণত ৩২-৩৪ বছর বয়সে তার উৎপাদন আয়ু শেষ করে। আয়ু অতিক্রান্ত গাছগুলো কেটে পুনরায় বাগান তৈরি করা হয়। এ সকল গাছ থেকে গড়ে ৫-৮ ঘনফুট গোল কাঠ পাওয়া যায়। ইতিহাস থেকে জানা যায়-দক্ষিণ আমেরিকার আমাজান উপত্যকার প্রাকৃতিক বনাঞ্চল হচ্ছে রাবার গাছের আদি নিবাস। ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম রাবার আবিষ্কারক হিসেবে গণ্য করা হয়। জানা যায় ১৪৯৬ সালে তার দ্বিতীয় যাত্রার পর তিনি কিছু রাবার বল নিয়ে আসেন, যা এক ধরনের গাছের আঠা থেকে তৈরি। হাইতির লোকেরা খেলার জন্য উক্ত বল ব্যবহার করতো। ১৮৭৩-১৮৭৬ সালের মধ্যে ব্রিটিশ নাগরিকের একটি উৎসাহী দল আদি বাসস্থান ব্রাজিল থেকে কিছু রাবার বীজ এনে পরীক্ষামূলকভাবে লন্ডনের কিউগার্ডেনে রোপণ করেন। এখান থেকে প্রায় ২০০০ চারা বর্তমান শ্রীলঙ্কাতে প্রেরণ করা হয় এবং সেখান থেকে কিছু সংখ্যক চারা মালয়েশিয়া, জাভা দ্বীপপুঞ্জ, সিঙ্গাপুর এবং পরবর্তীতে কিছু চারা ভারত ও অন্যান্য দেশে পাঠানো হয়। এ চারাগুলো হতেই প্রাচ্যে রাবার চাষের গোড়াপত্তন হয়।
রাবার কী
রাবার হলো প্রাকৃতিক উপায়ে সংগৃহীত একটি জৈব পদার্থ। সহজ করে বলতে গেলে রাবার গাছের কষই হচ্ছে রাবার। গাছ থেকে আহরিত কষ যা নিয়মমাফিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘনীভূত হয়ে শক্ত হয়। সেই কষ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে প্রাকৃতিক রাবারকে ব্যবহার উপযোগী করে মানুষের বিভিন্ন চাহিদা মেটানো হয়।
মূলত এ কষ সংগ্রহ করতে রাবারচাষিদের দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে গাছের কষ সংগ্রহ করতে গাছের সাথে বাটি বেঁধে একটি পাইপ লাগিয়ে (অনেকটা খেজুর গাছ থেকে খেজুর রস তোলার আদলে) সাদা আঠালো কষ রাবার চাষিরা গাছ থেকে সংগ্রহ করে থাকেন। পরিপক্ব রাবার গাছ হতে নিয়ন্ত্রিত কাটার মাধ্যমে কষ সংগ্রহ করার পদ্ধতিকে টেপিং বলে। রাবার বাগান থেকে এ কষ আহরণই বাগান বনায়ন করার মূল উদ্দেশ্য। সঠিক টেপিংয়ের মাধ্যমে রাবার গাছ হতে সর্বাধিক পরিমাণ কষ আহরণ করা সম্ভব। কিন্তু ভুল পদ্ধতিতে টেপিংয়ের ফলে গাছের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এ সমস্ত কারণে সঠিক পদ্ধতিতে টেপিং করে কষ আহরণ করা রাবার উৎপাদনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই টেপিং সংশ্লিষ্ট কাজে জড়িত সকল স্তরের কর্মকর্তা, কর্মচারী শ্িরমকদের সতর্ক থেকে সঠিক পদ্ধতিতে কষ আহরণের জন্য দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হয়। গাছের ছাল হচ্ছে রাবারের একমাত্র উৎপাদনশীল অংশ। ছালের ভেতরের অংশে রয়েছে লেটেক্স ভেসেল বা রাবার উৎপাদনকারী কষনালী। এই কষনালীগুলোতেই দুধের মতো সাদা রাবার কষ সঞ্চিত থাকে। টেপিং করার সময় ছালের বাইরের দু’টি স্তর ভেদ করে এই কষনালীর স্তর কেটেই রাবার কষ সংগ্রহ করা হয়।
রাবার গাছ টেপিংয়ের সময়,
নিয়ম ও পদ্ধতি
একটি পরিপক্ব রাবার গাছ থেকে বেশি কষ সংগ্রহ করতে হলে টেপিং কাজটা সূর্য ওঠার আগে অর্থাৎ খুব ভোরে করা উচিত। এ সময় সূর্যের আলো পর্যাপ্ত না থাকায় গাছে প্রস্বেদন ক্রিয়া শুরু না হওয়ায় কষনালীতে কষপ্রবাহ চালু থাকে। সূর্যের তাপ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে কষনালীসমূহ সঙ্কুচিত হয়ে যায় ফলে কষপ্রবাহে তার স্বাভাবিক গতির ব্যাঘাত ঘটে। চারা রোপণ থেকে ৬ বছর পর সাধারণত রাবার গাছ টেপিং উপযোগী হয়ে থাকে, এ ক্ষেত্রে রাবার গাছ টেপিংয়ের সময় নি¤েœাক্ত নিয়মপদ্ধতি অনুসরণ করা একান্ত আবশ্যক।
১.    গাছ বড় না হওয়া পর্যন্ত টেপিং করা উচিত নয়। কলম করা গাছের ক্ষেত্রে কলমের সংযোগস্থল থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার উচ্চতায় এবং গাছের বেড় ৪৫ সেন্টিমিটার হলে টেপিং করা উচিত।
২.    টেপিং কাটা বাম পাশের ওপরের দিক হতে ক্রমশ ঢালু হয়ে ডান পাশের নিচের দিকে হওয়া উচিত।
৩.    যথাসম্ভব টেপিং কাজটি ফ্ল্যাট রাখা উচিত।
৪.    প্রতি মাসে ১৫ মি:মি: এর অধিক পুরো ছাল কোনভাবেই কাটা উচিত নয়। বেশি ছাল কাটলেই কষ উৎপাদন বাড়বে না সে দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে।
৫.    সূর্য ওঠার আগেই অর্থাৎ আবছা আঁধারে টেপিংয়ের কাজ শুরু করা উচিত।
৬.    টেপিং করার অস্ত্র খুবই ধারালো হওয়া আবশ্যক।
৭.    টেপিং করার পূর্বে টেপিং স্থান ও বাটি পরিষ্কার করে নেয়া দরকার। এতে কষ দূষিত হবে না।
৮.    টেপিংয়ের সময় সব কিছুতেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা রক্ষা করা উচিত।
৯.    কারখানায় নিয়ে জমাট বাঁধার প্রক্রিয়া শুরু না করা পর্যন্ত কষে তরল অবস্থা বজায় রাখা দরকার। প্রয়োজনে এন্টি কোয়াগুলেন্ট (অ্যামোনিয়া) ব্যবহার করা উচিত।
১০.    টেপিংয়ের প্রতিটি কাজ আন্তরিক ও নিষ্ঠার সাথে পালন করা উচিত।
বাংলাদেশে রাবার চাষ ও আবহাওয়া
বাংলাদেশে রাবার চাষের প্রাপ্ত তথ্যাবলিতে জানা যায় কলকাতা বোটানিক্যাল থেকে ১৯১০ সালে কিছু চারা এনে চট্টগ্রামের বারমাসিয় ও সিলেটের আমু চা বাগানে রোপণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে বনবিভাগ টাঙ্গাইলের মধুপুর, চট্টগ্রামের হাজেরিখিল ও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় পরীক্ষামূলক কিছু গাছ রোপণ করে। ১৯৫৯ সনে জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বিশেষজ্ঞ মি. লয়েড এ দেশের জলবায়ু ও মাটি রাবার চাষের উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে রাবার চাষের সুপারিশ করেন। ১৯৬০ সালে বন বিভাগ ৭১০ একরের একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রামের রাউজানে ১০ একর এবং কক্সবাজারের রামুতে ৩০ একর বাগান সৃষ্টির মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে এ দেশে রাবার চাষের যাত্রা শুরু হয়। রাবার চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৬২ সালে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফআইডিসি) ওপর রাবার চাষ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব ন্যস্ত করে। বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন বাংলাদেশ সরকার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৭টি, সিলেট অঞ্চলে ৪টি এবং টাঙ্গাইল-শেরপুর অঞ্চলে ৫টিসহ মোট ১৬টি বাগানে সর্বমোট ৪৩৬৩৫ একর এলাকায় রাবার বাগান সৃষ্টি করেছে।
রাবার গাছ পরিবেশবান্ধব
প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি রাবার গাছ পরিবেশের একান্ত বন্ধু হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে সমর্থ হয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় এ গাছের অবদান অন্য যেকোনো পদ্ধতির চেয়ে উল্লেখ করার মতো। বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় রাবার গাছ গুরুত্বর্পূণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এ গাছ অন্য যেকোনো গাছের চেয়ে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পরিমাণ অক্সিজেন উৎপাদন এবং কার্বন শোষণ করে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি হেক্টর রাবার বাগান (যেখানে প্রায় ৪১৫টি উৎপাদনশীল রাবার গাছ রয়েছে) বায়ুমন্ডল থেকে বার্ষিক ৩৯.০২ টন কার্বন শোষণ করে, যা উষ্ণতা রোধে ও পরিবেশ রক্ষায় অতি গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং রাবার গাছ যেমন আমাদের অর্থনীতি বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে ঠিক তেমনি পরিবেশ রক্ষায় সে সমান অবদান রেখে যাচ্ছে।
দেশের অর্থনীতি ও মানুষের কর্মসংস্থানে রাবার চাষের ভূমিকা : দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে রাবারের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। গ্রামীণ এলাকায় মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে রাবার চাষ। উৎপাদিত রাবার কাঁচামাল হিসেবে শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার উপযোগী করতে এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিপণনের জন্য অনেক লোকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। রাবার দেশের প্রধান অর্থকরী ফসলের মধ্যে অন্যতম তাই বাণিজ্যিকভাবে রাবার চাষ করা এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি বছর উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ১৫ থেকে ১৬ হাজার টন। আন্তর্জাতিক বাজারে যার মূল্য প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। দেশীয় বাজারে এক কেজি কাঁচা রাবারের দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা। আর আন্তর্জাতিক বাজারে এর দাম ২৩৮ থেকে ২৪০ ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি বছর প্রায় ১২ মিলিয়ন টন প্রাকৃতিক রাবারের চাহিদা রয়েছে। এই চাহিদার ৯৪ শতাংশ পূরণ করে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ। এর মধ্যে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডে ৭২ শতাংশ চাহিদা পূরণ করে। গড়ে প্রতি বছর থাইল্যান্ডে ৩০ লাখ টন, ভিয়েতনামে ৮ লাখ টন এবং ভারতে ৬ লাখ টন প্রাকৃতিক রাবার উৎপাদন হয়। বিশ্বে রাবারের চাহিদা বিবেচনা করে বাংলাদেশে আরো ব্যাপকভাবে রাবারের চাষকে গতিশীল করতে হবে। বর্তমানে দেশে ৭০ হাজার একর জমিতে রাবার চাষ করা হচ্ছে। এর মাঝে ৩১ হাজার একর জমিতে সরকারি বাগান এবং বাকি ৩৯ হাজার একর জমিতে বেসরকারি উদ্যোগে রাবার চাষ হয়। বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন রাবার দেশে উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে ৪ হাজার টন রাবার বিদেশে রফতানি করা হয়। জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের (এফএও) সমীক্ষা অনুযায়ী ২০২০ সাল নাগাদ দেশে কাঁচা রাবারের চাহিদা হবে ১ লাখ টন। এ জন্য ১ লাখ ৮৫ হাজার একর জমি রাবার চাষের আওতায় আনার পরার্মশ দেয়া হয়েছে। সে লক্ষ্যে সরকার ২০২০ সালের মধ্যে দেশে কাঁচা রাবার উৎপাদন বৃদ্ধি ও রাবারজাত দ্রব্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এতে রাবার চাষযোগ্য এলাকা হিসেবে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বৃহত্তর সিলটে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসংিহ, জামালপুর, শেরপুর, বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী ও বগুড়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে এবং বেসরকারিভাবে সরকারের পক্ষ থেকে রাবার চাষে নানাভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
রাবার থেকে উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী
স্বাধীনতার পূর্বে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ১০-১৫টি রাবারভিত্তিক ছোট ছোট কারখানা ছিল। স্বাধীনতাত্তোর সময়ে পর্যায়ক্রমে রাবারের উৎপাদন ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে বেসরকারি মালিকানায় বিভিন্ন সময়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রায় ৪০০টির মতো রাবারভিত্তিক শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানা থেকে তৈরি হচ্ছে নানা প্রকারের রাবার সামগ্রী। বাংলাদেশে বিএফআইডিসি’র উৎপাদিত কাঁচা রাবার মিনিবাস, প্রাইভেটকার, বেবিট্যাক্সি, মোটরসাইকেল, রিক্সা, বাইসাইকেলের টায়ার-টিউব, চপ্পল, হোস পাইপ, রাবার সোল, বাকেট, গ্যাসকেট, অয়েলসিল, পাট ও বস্ত্রশিল্পের ব্যবসায়ী বিএফআইডিসি’র রাবার টেন্ডারের মাধ্যমে ক্রয় করে বিদেশে রফতানি করে থাকে। ইতঃপূর্বে রাবার জ্বালানি কাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে বিএফআইডিসির শিল্প ইউনিটগুলোতে ট্রিটমেন্ট ও সিজনিং করে বিভিন্ন ধরনের উন্নতমানের আসবাবপত্র যেমন সোফাসেট, খাট, দরজা-জানালা, ডাউনিং টেবিল, চেয়ার ইত্যাদি তৈরি করে দেশে বিদেশে রফতানি করা হচ্ছে। ট্রিটমেন্ট ও সিজনিং করা রাবার কাঠের গুণগতমান সেগুনকাঠের সমপর্যায়ের যা অতিশয় টেকসই ও সুন্দর।
শেষকথা
সব দিক বিবেচনা করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, রাবার শিল্প বাংলাদেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। রাবার চাষের সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তারা মনে করেন রাবার চাষকে সম্প্রসারণ করতে হলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া এ শিল্পকে কোনোভাবে গতিশীল রাখা সম্ভব নয়। আমাদের পার্শ¦বর্তী দেশ ভারতে রাবার চাষিদের বিশেষ রফতানি ও ভর্তুকি সুবিধাসহ সহজ শর্তে ঋণ, অনুদান ও রাবার বোর্ড গঠনের মাধ্যমে হাতে-কলমে শিক্ষাসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। সেটাকে দৃষ্টান্ত রেখে আমাদের দেশের রাবার চাষিরাও যদি আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে সে রকম সুযোগ-সুবিধা ও সহযোগিতা পায় তবে রাবার শিল্প বাংলাদেশের এক অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারবে।
তা ছাড়া দেশের বেকারত্ব দূর করতে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে রাবার শিল্পকে একটি টেকসই অবকাঠামো দেয়া প্রয়োজন।
দুর্দান্ত একটি বছর কাটানোর পর আরো বড় স্বপ্নের হাতছানি টাইগারদের সামনে। স্বপ্নযাত্রাটা শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপ দিয়েই। মাঝখানে এশিয়া কাপ থাকলেও টাইগারদের আসল টার্গেট ওই বিশ্বকাপ। তবে একদিনের ফরম্যাটে নয়, টি-২০ বিশ্বকাপ। খেলা হবে প্রতিবেশী ভারতে।
বিশ্বকাপ ছাড়াও পাকিস্তান, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অবিশ্বাস্য সাফল্যের জের ধরে বাংলাদেশ এখন লাইমলাইটে। আলোর এই ঝলমলে রাস্তা থেকে টাইগাররা সরে আসতে চায় না। আর তা-ই কঠোর অনুশীলন করছে তারা। এমনকি সামনে যে এশিয়া কাপ আছে, সেটাকেও একটু কম গুরুত্ব দিয়ে। এ কারণেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট বা একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ না খেলে খেলেছে টি-২০ ম্যাচ। অবশ্য, এই ফরম্যাট একটু কম খেলা হয়েছে বলে হিসাব এখনো বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। পরিণতিতে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মতো সাফল্য ধরা দিচ্ছে না। তবে ঘাটতি পুষিয়ে নিতে অনেক কিছুই করা হচ্ছে। বিপিএলও সেই লক্ষ্যেই ছিল। তারপর জিম্বাবুয়ে সিরিজ।
এশিয়া কাপ অবশ্য এবার বাংলাদেশে হওয়ার কথা ছিল না। ভারতে হবে বলে জানানো হয়েছিল। কিন্তু ভারত অপারগতা প্রকাশ করলে বাংলাদেশ এই সুযোগটি পায়। ভারত টি-২০ বিশ্বকাপের দিকেই পুরো নজর দিতে চাচ্ছে। ফলে ১৩তম এশিয়া কাপ বাংলাদেশে হচ্ছে। আবার এ নিয়ে টানা তৃতীয়বার এই সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ। এটাও একটা রেকর্ড। তবে এবারের এশিয়া কাপ প্রথমবারের মতো হবে টি-২০ ফরম্যাটে। এ দিক থেকে এটাও একটা মাইলফলক।
ঢাকায় এবারের আসর অনুষ্ঠিত হবে ২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ছাড়াও এশিয়ার দু’টি সহযোগী দেশ খেলবে এই টুর্নামেন্টে।
এর আগে ২০১২ ও ২০১৪ এশিয়া কাপের সফল আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ। ২০১২ সালে বাংলাদেশ ফাইনালে খেললেও ২০১৪ সালে সুবিধা করতে পারেনি। তবে বাংলাদেশ বর্তমানে যে ফর্মে রয়েছে, তাতে এবার ঘরের মাঠে টাইগাররা চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
স্বপ্ন কিন্তু ২০১২ সালে ভালোভাবেই সামনে এসেছিল। মাত্র ২ রানের জন্য হাত থেকে স্বপ্নটি ফসকে গিয়েছিল। এখন যে ফর্মে রয়েছে টাইগাররা, তাতে করে শিরোপাটা তাদের হাতে ধরা দিলে সত্যিই কেউ অবাক হবে না।
এশিয়া কাপ শুরু হয়েছিল সেই ১৯৮৪ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায়। এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সাফল্য ভারত ও শ্রীলঙ্কার। তারা উভয়ে পাঁচবার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।
টি-২০ বিশ্বকাপে অবশ্য বাংলাদেশ সরাসরি মূল পর্বে খেলতে পারছে না। ১৬ দলের টি-২০ বিশ্বকাপে সরাসরি মূল পর্বে খেলা নিশ্চিত আইসিসির পূর্ণ সদস্যভুক্ত ১০ দেশের। তবে এ ১০ দেশের মধ্যে টি-২০ র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৮টি দেশ আবার সরাসরি টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় পর্ব বা সুপার টেনে খেলবে। বাকি দুই দল বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়েকে খেলতে হবে বাছাইপর্ব উতরে আসা ছয়টি দলের সঙ্গে প্রথম রাউন্ড। প্রথম রাউন্ড থেকে শীর্ষ দুই দল সুপার টেনে খেলার সুযোগ পাবে।
সুপার টেনে ওঠার লড়াইয়ে বাংলাদেশ রয়েছে ‘এ’ গ্রুপে। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড ও ওমান। তবে আশা করা হচ্ছে, এই পর্ব উতরাতে খুব একটা সমস্যা হবে না। সুপার টেনের দিকেই বাংলাদেশের মনোযোগ। সেখানে অবশ্য বাংলাদেশ বেশ কঠিন গ্রুপেই পড়েছে। সেখানে খেলতে হবে ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। চারটি দলই দুর্ধর্ষ, কারো চেয়ে কেউ কম নয়। তবে টাইগাররাও বা এখন কার থেকে কম! কাজেই বুক চেতিয়ে লড়াই হবে।
‘বি’ গ্রুপে রয়েছে জিম্বাবুয়ে, স্কটল্যান্ড, হংকং ও আফগানিস্তান।
৮ মার্চ নাগপুরে প্রথম রাউন্ডের ম্যাচ শুরু হবে। প্রথম দিনে দু’টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। ৮ থেকে ১৩ মার্চ হবে প্রথম রাউন্ডের খেলা। এই রাউন্ডে বাংলাদেশের তিনটি ম্যাচ হবে ৯, ১১ ও ১৩ মার্চ। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ যথাক্রমে নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড ও ওমান।
সুপার টেনে শীর্ষ আট দলের গ্রুপিং ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। গ্রুপ-১-এ রয়েছে শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও ইংল্যান্ড।
আর গ্রুপ-২-এ রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। প্রথম পর্ব পেরোতে পারলে বাংলাদেশ গ্রুপ-২-এ অন্তর্ভুক্ত হবে।
দ্বিতীয় রাউন্ড বা চূড়ান্ত পর্বের খেলা শুরু হবে ১৫ মার্চ। আর ফাইনাল ম্যাচের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ হবে ৩ এপ্রিল।
ভারতের আটটি শহরে হবে ম্যাচগুলো। এগুলো হলো : ব্যাঙ্গালুরু, চেন্নাই, ধর্মশালা, মোহালি, মুম্বাই, নাগপুর, নতুনদিল্লি ও কলকাতা।
একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে মেয়েদের আন্তর্জাতিক টি-২০ বিশ্বকাপও। মেয়েদের টি-২০ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ থাইল্যান্ডে ইতোমধ্যে বাছাইপর্ব থেকে চূড়ান্তপর্ব নিশ্চিত করেছে। মেয়েদের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ রয়েছে ‘বি’ গ্রুপে। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ভারত ও পাকিস্তান।
সব ক্রিকেটেই বাংলাদেশ আবারো বাঘের গর্জনে বিশ্বকে কাঁপাবে, এটাই সবার প্রত্যাশা। সবাই প্রস্তুত টাইগারদের সেই আতঙ্ক ছড়ানিয়া গর্জন শোনার জন্য।
প্রশ্ন : আপনার নির্মিত শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র কী কী এবং কোন বিষয়ের ওপর নির্মিত?
ফয়সল হোসেন
রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ
ছটকু আহমেদ : বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রযোজিত দুটো ছবি ‘মুক্তিযুদ্ধ ও জীবন’ এবং ‘জন্মজয়ন্তী’। ‘মুক্তিযুদ্ধ ও জীবন’ মুক্তিযুদ্ধের সময় ছেলেমেয়ে, দাদী ও বউকে নিয়ে একটি পরিবার ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে কিভাবে আশ্রয়ের সন্ধানে গিয়েছিলো এবং পরে ওই পরিবারের ছেলেমেয়েরা কী করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলো তার ওপর লেখা। আর ‘জন্মজয়ন্তী’ নির্মিত হয়েছিলো একটি শিশু স্কুলে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী পালন উপলক্ষে গান আবৃত্তি, নাচ, ছড়া ও অভিনয়কে কেন্দ্র করে।
প্রশ্ন : আপনার স্কুলজীবনের একটি স্মরণীয় দিনের কথা বলুন?
মো: আকবর হোসেন, কমলনগর, লক্ষ্মীপুর
ছটকু আহমেদ : নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলে তখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়তাম। বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমি একটা কবিতা আবৃত্তি করছিলাম। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘চল চল চল’। যখন মঞ্চে ওঠে সামনে দর্শকের সারির দিকে চোখ গেলো তখন ভয়ে আমার পা কাঁপতে লাগলো। আর সেই ভয়ে এত দ্রুত কবিতাটা পড়েছিলাম যে আমার স্যাররা হেসে উঠেছিলেন। আর সেই লজ্জাটাই আমাকে পরে সাহসী হতে শিক্ষা দিয়েছিলো। তোমরাও যেকোনো ভালো কাজে লজ্জা পেয়ে না, থেমে সাহস নিয়ে এগিয়ে যেও, জয় তোমাদের নাগালের মধ্যে চলে আসবে।
প্রশ্ন : বর্তমান আমাদের চলচ্চিত্রে অশ্লীল প্রদর্শনী যে হারে বাড়ছে তাতে বিশেষত কিশোররা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা কি জাতিকে শালীনতাপূর্ণ চলচ্চিত্র উপহার দিতে পারি না?
বায়েজিদ হোসাইন
ছটকু আহমেদ : অবশ্যই পারি। তোমরা সবাই যদি হলে ছবি দেখতে এসে সেই সব অশ্লীল ছবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করো তাহলেই শালীনতাপূর্ণ ছবি নির্মাণ করতে ওরা বাধ্য হবে।
প্রশ্ন : আপনার জীবনের স্মরণীয় একটি ঘটনা জানতে চাই।
রুমান হাফিজ, কানাইঘাট, সিলেট
ছটকু আহমেদ : তখন আমি ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়ি, ১৯৬৮তে পূর্ব পাকিস্তান (এখন বাংলাদেশ) ইন্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট টেবিল টেনিস সিঙ্গেলস প্রতিযোগিতার ফাইনাল। ফাইনালে আমার অপোনেন্ট ছিলো রাজশাহীর এক ছাত্র। বেস্ট অব ফাইভ খেলা। প্রথম দুটোতে আমি খুব সহজেই জিতলাম এবং পরের দুটোতে আমি খুব সহজেই হেরে গেলাম। আর একটা বাকি। যে জিতবে সে চ্যাম্পিয়ন। জয়ের ধারাবাহিকতায় আমার অপোনেন্ট তখন উজ্জীবিত। খুব টেনশনে আমি। এর মধ্যে প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে আড়ালে ডেকে বললেন, তোমাকে জিততে হবে নইলে ঢাকার মান থাকবে না। আমার মনোবল বেড়ে গেলো। টেনশনকে দূরে সরিয়ে মনোবল নিয়ে খেলে ৫ম খেলায় আমি ২১-১৮তে গেমটা জিতে চাম্পিয়ন হলাম। প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে আনন্দে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। এটা আমার জীবনের অনেক স্মরণীয় ঘটনার মধ্যে একটা। তোমরাও চেষ্টা করবে টেনশনকে দূরে সরিয়ে মনোবলকে দৃঢ় করলে তবে আকাক্সিক্ষত ফল পেয়ে যাবে।
প্রশ্ন : ছাত্র অবস্থায় জীবনে আপনার লক্ষ্য কী ছিল?
মো: সোলায়মান সুমন
পাপুয়া, সোনাইমুড়ি, নোয়াখালী
ছটকু আহমেদ : সাত্যি বলতে কি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিলো না। আমি সব কিছু হতে চাইতাম। ভালো ক্রিকেট খেলতাম, ব্যাডমিন্টন ও দাবা খেলতাম, টেবিল টেনিস খেলতাম, আবৃত্তি ও অভিনয় করতাম, নাটক পরিচালনা করতাম, নাটক লিখতাম এবং সবগুলোতে আমি অনেক অনেক পুরস্কার পেয়েছি।
প্রশ্ন : সৃজনশীল ক্যারিয়ার গড়ার জন্য শিল্প-সাহিত্যের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?
ইয়াকুব আল মাহমুদ
সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী
ছটকু আহমেদ : অবশ্যই গঠনমূূলক এবং উপদেশমূলক, যা তোমাকে সাহায্য করবে ক্যরিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে।
প্রশ্ন : ছোটবেলায় আপনি কি খুব শান্তশিষ্ট ছিলেন নাকি দুষ্টু ছিলেন?
এস এম শাহীন
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ছটকু আহমেদ : দুটোর একটাও না। শান্ততো ছিলাম না, আর দুষ্টতো নই। আমি কোন গোলমাল পছন্দ করতাম না। ভালো কাজে এগিয়ে যেতাম, খারাপ কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতাম।
প্রশ্ন : বর্তমানে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণসমাজের ভূমিকা কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
এ জে তালহা
রাজিবপুর ডিগ্রি কলেজ, জামালপুর
ছটকু আহমেদ : ডিজিটাল মানেই তারুণ্যনির্ভর প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির সার্থকতা নির্ভর করছে সম্পূর্ণরূপে তরুণদের ওপর। তাদেরই অগ্রণী ভূমিকা থাকবে বাংলাদেশ বিনির্মাণে। তবে প্রবীণদের অভিজ্ঞতাকে অবশ্যই সঙ্গে নিতে হবে। নইলে প্রযুক্তি টেকসই হবে না।
প্রশ্ন : চলচ্চিত্রে আপনার শুরুটা কিভাবে?
মো: নুরুল্লাহ হোসেন, রোনগর, মহম্মদপুর, মাগুরা
ছটকু আহমেদ : আমি তখন দিনাজপুর ইরিগেশন বিভাগে উপসহকারী প্রকৌশলী-কাম-সেকশন অফিসার। সরকারি চাকরি। এই সময় আমার বাল্যবন্ধু হাবিব (হাবিবুর রহমান খান) ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিটি নির্মাণ করার জন্য ভারতের বিখ্যাত পরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটককে বাংলাদেশে নিয়ে এলেন। দৈনিক ইত্তেফাকে একটা নিউজ করে জানালেন তার সহকারী পরিচালক হিসেবে অনেকের সাথে আমি থাকবো। তারপরই তার ফোন পেয়ে চলে এলাম ঢাকায়। শুরু হলো চলচ্চিত্রে পথচলা।
প্রশ্ন : নৈতিকতাসমৃদ্ধ সমাজগঠনে তরুণরা কী করবে বা তাদের দায়িত্ব কী?
আজমাইন মাহতাব
রাহাত্তার পুল, চট্টগ্রাম
ছটকু আহমেদ : তরুণরা সবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবে। তাদের দায়িত্ব নৈতিক অবক্ষয় রোধ করতে মানুষকে সচেতন করা। অনৈতিক কর্মকান্ডের কুফল এবং নৈতিক কর্মের সুফল তাদের বোঝাতে হবে। কিছু ঢেকে রাখলে চলবে না।
প্রশ্ন : এ পর্যন্ত কয়টি সিনেমার কাহিনী-চিত্রনাট্য-সংলাপ নির্মাণ করেছেন? বিখ্যাত কয়েকটি সিনেমার নাম জানতে চাই।
মু: আশরাফুল চৌধুরী
ছোটশালঘর, দেবিদ্বার, কুমিল্লা
ছটকু আহমেদ : প্রায় তিন শতাধিক। সত্যের মৃত্যু নেই, বুকভরা ভালোবাসা, বুকের ভিতর আগুন, মিথ্যার মৃত্যু, সত্যমিথ্যা, বাংলার বধূ, পিতা-মাতা সন্তান, ঘাতক, চেতনা, স্বামী কেন আসামী, মেয়েরাও মানুষ, জবাবদিহি, শেষযুদ্ধ, নাত বৌ ইত্যাদি।
প্রশ্ন : বর্তমানে সারা বিশ্ব অপসংস্কৃতিতে নিমজ্জিতপ্রায়। এ থেকে কিভাবে ছাত্রসমাজকে রক্ষা করা যায়?
সাইফুল্লাহ হাসান, জুড়ী, মৌলভীবাজার
ছটকু আহমেদ : ঢালাওভাবে সব অপসংস্কৃতি বলা যাবে না। কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে যা খারাপ তা হলিউডে বা বলিউডে খারাপ না। আবার ওদের ওখানে যা খারাপ তা আফ্রিকানদের কাছে খারাপ না। অপসংস্কৃতি রোধ করতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। ছাত্রসমাজ সচেতন হলে নিজেই তাকে বয়কট করবে।
প্রশ্ন : একটি সফল সিনেমা নির্মাণের জন্য কী কী উপকরণ প্রয়োজন?
মুহাম্মদ শাহাদাত হুসাইন
সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী
ছটকু আহমেদ : একটা ভালো গল্প। একজন ভালো পরিচালক, একজন ভালো ক্যামেরাম্যান, একজন ভালো এডিটর, একজন ভালো সঙ্গীত পরিচালকের কিছু শ্রুতিমধুর গান। ভালো অভিনেতা-অভিনেত্রী।
প্রশ্ন : আমরা কিভাবে উজ্জ্বল আলোকিত মানুষ হতে পারি?
মো: জাবেদ ইকবাল
হাজিরহাট মিল্লাত একাডেমি, কমলনগর, লক্ষ্মীপুর
ছটকু আহমেদ : উজ্জ্বল আলোকিত মানুষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ নেই। এটা কোন মেশিনের সাহায্যেও হবে না। এর জন্য চাই তোমার দেহের ভেতর যে মন আছে তার পরিশুদ্ধতা। তোমার মন যেন অসহায় দুঃখী মানুষের সাহায্যে এগিয়ে যায়। তোমার মন যাতে দেশের কাজে এগিয়ে আসে, আর্তমানবতার সেবা করতে উদ্বুদ্ধ হয়। মনকে সততার সাথে নিষ্ঠার সাথে, দৃঢ়তার সাথে, একাগ্রতার সাথে সঠিক পথে পরিচালনা করতে পারলেই তুমি উজ্জ্বল আলোকিত মানুষ হতে পারবে।
প্রশ্ন : আপনার জন্ম কবে কোথায়? আপনি কোন স্কুলে পড়ালেখা করেছেন?
সাজিয়া রহমান
কচুয়া, চাঁদপুর
ছটকু আহমেদ : আমার জন্ম ১৯৪৬ সালে ৬ অক্টোবর, রোববার, ঢাকায়। স্কুলজীবন কেটেছে চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে। চট্টগ্রাম মিউনিসিপাল হাইস্কুলে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়েছি, ফাইভ থেকে এসএসসি পাস করেছি নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুল থেকে। মাঝখানে এক বছর ক্লাস নাইনে পড়েছি নারায়ণগঞ্জ জয়গোবিন্দ হাইস্কুলে।
প্রশ্ন : ছোটবেলায় কী হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন আর সেই স্বপ্নটি বাস্তবায়ন করার জন্য কতটুকু পরিশ্রম করতেন?
কলিমুল্লাহ, বরিশাল
ছটকু আহমেদ : আমি কোন একটা কিছু নিয়ে কখনো স্বপ্ন দেখিনি। আমি অনেক কিছুই হতে চেয়েছিলাম। ক্রিকেট প্লেয়ার, দাবারু, টেবিল টেনিস প্লেয়ার, নাট্যকার, নাট্য পরিচালক, আবৃত্তিকার, লেখক এবং ছোটবেলায় এসব কিছুতেই আমি পরিশ্রম করে সফলতা অর্জন করে পুরস্কৃত হয়েছি। আমাদের তখন গাইড করার কেউ ছিলেন না। তাই একটা কিছুতে মনোনিবেশ করা হয়ে ওঠেনি।
প্রশ্ন : কী ধরনের চলচ্চিত্র ছাত্রদের জন্য উপযোগী বলে আপনি মনে করেন?
শরীফ উদ্দীন, চট্টগ্রাম মুহসীন কলেজ
ছটকু আহমেদ : আগে হলে বলতাম শিক্ষণীয় চলচ্চিত্র। কিন্তু এখন বলবো সব ধরনের চলচ্চিত্রই ছাত্রদের দেখা উচিত। কারণ সব চলচ্চিত্রে শিক্ষণীয় কিছু থাকে। খারাপের মধ্যে ভালো কিছু লুকিয়ে থাকে। ছাত্রদের আহরিত শিক্ষা দিয়ে সেই ভালোটা খুঁজে নিতে হবে। নইলে সার্থক ছাত্র হওয়া যাবে না।
প্রশ্ন : আপনার সন্তান কয়জন এবং তারা কে কী করেন?
মু: আবু নাঈম, হাড়িভাসা, পঞ্চগড়
ছটকু আহমেদ : আমার চার মেয়ে। বড় মেয়ে সাদিয়া আহমেদস্নিগ্ধা। এমকম ম্যানেজমেন্ট। মেজ মেয়ে ফারিয়া আহমেদ স্থীরা। এমবিএ ফাইন্যান্স। সেজ মেয়ে শাহরিয়া আহমেদ স্রতা। এমএসসি ফার্মাসি। ছোট মেয়ে নাজিয়া আহমেদ শ্বেতা। ছাত্রী। জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে তৃতীয় বর্ষ অনার্স (পদার্থ) ফাইনাল দিচ্ছে। সেজ মেয়ে ¯œাতা বিদেশী ওষুধ কোম্পানির এমএসটি (ম্যানুফ্যাকচারিং সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি) অফিসার। বড় ও মেজ মেয়ে আগে চাকরি করতো এখন সংসার করছে।
প্রশ্ন : আপনি এই পর্যন্ত কতটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন?
বৃষ্টি, সাভার, ঢাকা
ছটকু আহমেদ : আমি ১৫টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছি আর ৪টি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি।
পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিগুলি হচ্ছেÑ ১. নাত বৌ (১১ নভেম্বর, ১৯৮২) ২. রাজদন্ড (১৯৮৪) ৩. গৃহবিবাদ (২৬ জুলাই ১৯৮৬। মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রেরিত ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) তিনটি পুরস্কার লাভ) ৪. অত্যাচার (২৩ এপ্রিল ১৯৮৭। কায়রো চলচ্চিত্র উৎসবে প্রেরিত) ৫. চেতনা (৫ জানুয়ারি ১৯৯০। গানে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন) ৬. মায়া মমতা (২৯ জানুয়ারি ১৯৯৪) ৭. সত্যের মৃত্যু নেই (১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬। কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত) ৮. বুকের ভিতর আগুন (৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭) ৯. মিথ্যার মৃত্যু (৮ মে ১৯৯৮) ১০. বুকভরা ভালোবাসা (৩০ এপ্রিল ১৯৯৯) ১১. বর্ষা বাদল (৭ জুলাই ২০০০) ১২. শেষ যুদ্ধ (২৯ মার্চ ২০০২। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনার ছবি) ১৩. মহা তান্ডব (২৭ সেপ্টেম্বর ২০০২) ১৪. আজকের রূপবান (১১ এপ্রিল ২০০৫। চ্যানেল আই প্রযোজিত) ১৫. প্রতিবাদী মাস্টার (৯ ডিসেম্বর ২০০৫)
স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি হচ্ছেÑ ১. আমার সংসার (পরিবার পরিকল্পনা সমিতি প্রযোজিত) ২. ঘোড়ার ডিম (এফডিসি প্রযোজিত) ৩. মুক্তিযুদ্ধ ও জীবন (বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রযোজিত) ৪. জন্মজয়ন্তী (বাংলাদেশ শিশু একাডেমি প্রযোজিত)
প্রশ্ন : বিখ্যাত পরিচালক ঋত্বিক ঘটক আপনার সিনেমা পরিচালনার ক্ষেত্রে কিভাবে প্রভাব ফেলেছেন?
রিজিয়া পারভিন
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ
ছটকু আহমেদ : স্যরি, উনার কোনো প্রভাব আমার ছবির ওপর নেই। কারণ উনি যে ধরনের ছবি বানান সেই ধরনের ছবি বানানোর মত প্রযোজক আমি পাইনি। ভালো ছবির পেছনে লক্ষ লক্ষ টাকা লস করতে কেউ আমাদের কাছে এগিয়ে আসেনি। তবে এখন একজন এসেছেন। যদি ইনি শেষ পর্যন্ত থাকেন তবে আমার এই নির্মিতব্য ছবি ‘দলিল’-এর ওপর ঋত্মিক ঘটকের প্রভাব আপনারা দেখতে পাবেন।
প্রশ্ন : বর্তমানে সিনেমার ক্ষুদ্র ভার্সন কি শর্ট ফিল্ম? আপনি কী মনে করেন?
সাইফুল ইসলাম, ঢাকা কলেজ
ছটকু আহমেদ : না। শর্ট ফিল্মের নিজস্ব একটা ভাষা আছে, যার গঠনপ্রণালী আলাদা। অল্প পরিসরে বিরাট একটা ভাবনার বিষয়কে শর্ট ফিল্ম তুলে ধরে।
প্রশ্ন : কিভাবে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব?
আফসানা
আশুলিয়া মডেল টাউন, ঢাকা
ছটকু আহমেদ : চলচ্চিত্রকে বলা হয় সবচেয়ে বড় গণমাধ্যম। আর গণ মানে হচ্ছে মানুষ। সোজা কথায় মানুষের মাধ্যম হচ্ছে চলচ্চিত্র। গল্প-কবিতা পড়ে, বক্তৃতা শুনে, আর চলচ্চিত্রে একসাথে দেখে ও শুনে। মানুষের সাথে চলচ্চিত্রের সরাসরি যোগাযোগ হয়। সুতরাং চলচ্চিত্র দিয়ে মানুষের মনের যত কাছাকাছি যাওয়া যায় আর কোন কিছুতেই তা সম্ভব নয়। আর এই জন্যই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব।
প্রশ্ন : বাংলাদেশে যে ধরনের চলচ্চিত্র বর্তমানে তৈরি হচ্ছে তাতে আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট?
তালহা
ইলিয়টগঞ্জ রা.বি উচ্চবিদ্যালয়, দাউদকান্দি, কুমিল্লা
ছটকু আহমেদ : না আমি মোটেই সন্তুষ্ট না। এখন ডিজিটালের নাম করে চলচ্চিত্রকে প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলেছে। চলচ্চিত্রের প্রাণ গল্পকে ওরা দূরে সরিয়ে দিয়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি যা চলচ্চিত্রের জন্য আশীর্বাদ তাকে এরা অভিশাপে রূপান্তরিত করে তুলেছে। তাই বিগত বছরে ৬৮ চলচ্চিত্রের মধ্যে ৬৬টি মুখ থুবড়ে পড়েছে। দর্শক কমছে। হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চোখধাঁধানো রঙ আর কান ফাটানো শব্দ দিয়ে মানুষের মনের গহিনে যাওয়া যায় না। তার সাথে একটা গল্পের সফল চিত্রায়ণ চাই। বাঙালি দর্শক গল্পপ্রিয়। আর সেই গল্পই এখনকার চলচ্চিত্রে নেই বললেই চলে। অনেকেতো আবার টেলিফিল্মকে চলচ্চিত্র বানিয়ে চালিয়ে দিচ্ছে। সুতরাং সন্তুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে এখনকার তরুণ মেধাবীদের দ্বারা এই চেহারা বদলে ফেলা সম্ভব।
প্রশ্ন : চলচ্চিত্র নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
রাসেল আহমেদ, ব্রাহ্মন্ধি, নরসিংদী
ছটকু আহমেদ: আমার বয়স হয়ে গেছে। সত্তরে পা দিয়েছি। এই বয়সে কোন পরিকল্পনা করে সাকসেস হওয়ার সুযোগ কম। আর আমি সেই রকম কোন পরিকল্পনা করি না যা শুধু পরীদের কল্পনায় থেকে যাবে বাস্তবে কোনদিন হবে না। কাজ না করে বড় বড় কথা দিয়ে মানুষকে আকৃষ্ট করার মধ্যে আমি নেই। আমি এখন ‘দলিল’ নামে একটা ভালো ছবি করার পরিকল্পনা নিয়েছি। আর আমি বিশ্বাস করি সবাই যদি একটা করে ভালো ছবি নির্মাণের পরিকল্পনা করে তবে দেশের চলচ্চিত্রের চেহারা বদলে যাবে।
প্রশ্ন : তরুণ নির্মাতাদের প্রতি আপনার উপদেশ কী?
রাজিয়া বানু
বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট
ছটকু আহমেদ : একটাই উপদেশ। তোমরা শুধু বিদেশী কালচারের ছবি বানিয়ে নিজেদের বড় বলে জাহির করতে চেষ্টা না করে নিজের দেশের সংস্কৃতি নিয়ে নিজের মাটির গল্প নিয়ে ছবি বানাও। কারণ তোমরা হলিউড, বলিউড এবং মাদ্রাজের ছবির বাজেট দিতে পারবে না। সুতরাং তার অনুকরণ করতে গিয়ে ছবি হবেÑ না ঘরকা না ঘাটকা। আর বিদেশী সংস্কৃতি লালন করা কোনো শিক্ষিত সমাজের পক্ষে ঠিক না।
হজরত ঈসা (আ)-এর জামানার এক ঘটনা। একদিন তিন বন্ধু একসাথে দূরে কোথাও হেঁটে যাচ্ছিল। এরা বেশ দুষ্ট প্রকৃতির ছিল। হাঁটতে হাঁটতে তারা এক স্থানে এসে থমকে দাঁড়াল। রাস্তার ওপর পিন্ডের মতো একটা বস্তুর ওপর তাদের চোখে পড়ল। সূর্যের আলো পড়ে পিন্ডটি চিকচিক করছিল। এ জন্য বন্ধু তিনজন বেশ কৌতূহলী হয়ে উঠল। তারা পিন্ডটির কাছে আসতেই বিস্মিত হলো। এ যে স্বর্ণপিন্ড। তাই তাদের খুশি আর কে দেখে! একেবারে চকচকে সোনার পিন্ড হাতে পেয়ে বন্ধু তিনজন নেচে উঠল।
বন্ধু তিনজন ছিল অতিশয় লোভী। তাই স্বর্ণপিন্ড পাবার পর তিনজনই মনে মনে দুরভিসন্ধি আঁটতে লাগল। এরা সবাই স্বর্ণপিন্ডটি একাই আত্মসাৎ করার ফন্দি আঁটছিল। তবে কেউ কারো কাছে তার এ গোপন ইচ্ছা প্রকাশ করল না। বন্ধু তিনজন সামনে পথ চলতে লাগল। অনেক দূর পথ চলতে চলতে এক সময় তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ইতোমধ্যে তাদের প্রচন্ড খিদেও পেল।
এদের একজন তো বলেই বসল, ‘ভাই। আর হাঁটতে পারছিনে। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। একটু থাম, পেটে কিছু দানাপানি দিয়ে নিই।’
এরপর দুই বন্ধু আরেকজনকে বলল, ‘ঠিকই বলেছ ভাই। খিদের চোটে আমাদেরও পেট জ্বলে যাচ্ছে। ঠিক আছে তুমি এখানে বস। সোনার পিন্ডটা তোমার কাছে যতœ করে রাখ। আমরা দু’জন বরং খাবার খুঁজে দেখি। আশা করি, ধারে কাছে কোথাও হয়তো খাবার পেয়ে যাবো।’
এ কথা বলেই দুই বন্ধু বেরিয়ে পড়ল। অনেক দূর পথ হাঁটল তারা। হাঁটতে হাঁটতে খানিক দূরে গিয়ে এক বাজারের সন্ধান পেল তারা। ওরা সেখানে খাবার কিনছিল আর নিজেরা স্বর্ণপিন্ড পাবার জন্য ফন্দি আঁটছিল। একজন বলল, ‘চল, আমরা খাবারে বিষ মিশিয়ে নেই। ফিরে গিয়ে বন্ধুটিকে বলব, আমরা খাবার খেয়ে এসেছি। তুমি এ খাবার খেয়ে নাও, বন্ধু। বিষ  মেশানো খাবার যেই না খাবে, আর অমনি সে মারা যাবে। তারপর আমরা দামি সোনার পিন্ডটি দু’জনে সমান সমান ভাগ করে নেবো।’
যেই ফন্দি সেই কাজ। বিষ মেশানো খাবার নিয়ে এরা বন্ধুর নিকট ফিরে এলো। এ দিকে তৃতীয় বন্ধুও এতক্ষণ বসে বসে একই কথা ভাবছিল। কিভাবে সোনার পিন্ডটি হাত করা যায়- এটা নিয়ে সেও নানা বুদ্ধি আঁটছিল। বন্ধুরা ফিরে আসার ফাঁকে সে ফন্দি ঠিক করে ফেলল। সে তার বন্ধু দু’জনকেই মেরে ফেলার কৌশল ঠিক করল।
ততক্ষণে বন্ধুরা খাবার নিয়ে ফিরে এলো। এসেই তারা বলল, ‘আরে বন্ধু, খুব যে দেরি হয়ে গেল। খিদেয় খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না? গরম গরম খাবার এনেছি। এই নাও হালুয়া রুটি। নাও নাও, পেট ভরে তা খেয়ে নাও।’
বন্ধুদের কথা শেষ হতে না হতেই তৃতীয় বন্ধুটি পকেট থেকে একটি বিষাক্ত চাকু বের করল। কিছু একটা বোঝার আগেই সে চাকুটি একে একে বন্ধুদের পেটে বসিয়ে দিল। বিষাক্ত চাকুর আঘাতে সে বন্ধুদের কাবু করে ফেলল। দু’জনই ঝটপট মাটিতে পড়ে ছটফট করতে লাগল। দেখতে দেখতে ক্ষণিকের মধ্যেই মারা গেল দুই বন্ধু।
এবার তৃতীয় বন্ধুটি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। আহা! কী খাঁটি সোনারে, বলতে বলতে সে সোনার পিন্ডে চুমু খেতে লাগল। এদিকে খিদের জ্বালায় ওর পেটও যে জ্বলছিল। বন্ধুরা খাবার এনেছে। তাই বন্ধুদের আনা হালুয়া রুটি সে গপাগপ খেয়ে ফেলল। রুটি খেতে দেরি, খাবারের বিষের কামড় তার দেহে আক্রমণ করতে দেরি হলো না। নিমেষেই তার সারা শরীর বিষের আক্রমণে নীল হয়ে গেল। দেখতে দেখতে তার দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে মারা গেল। তৃতীয় বন্ধুর নিথর দেহও পড়ে রইল মৃত বন্ধুদের পাশে। আর স্বর্ণপিন্ডটিও মৃত দেহের পাশেই পড়ে রইল।
সেই পথ দিয়েই কোথাও হেঁটে যাচ্ছিলেন হজরত ঈসা (আ)। তিন তিনটে লাশ ও স্বর্ণের পিন্ড তাঁর চোখে পড়ল। হজরত ঈসা (আ) ঘটনা দেখে অবাক হলেন। লোকগুলোর কান্ড দেখে তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এবার তিনি তাঁর সঙ্গীদের বললেন,
‘দেখলে তোমরা, লোভের করুণ পরিণতি? তিন তিনটে লোভী লোক মরে পড়ে আছে। খুব দুঃখ হচ্ছে এদের লোভ দেখে। অথচ স্বর্ণখন্ড এদের কারো ভাগ্যেই জুটল না। কী হতভাগাই না এরা?’
কথায় আছে লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু।
মুহিতের অনেক দিনের স্বপ্ন। দামি এক জোড়া অ্যাপেক্স জুতা কিনবে। একসাথে অনেক টাকা জমানো হয় না, তাই তার স্বপ্ন স্বপ্নেই খেলা করে। বন্ধুদের পায়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে আমিও কিনবো এ রকম জুতা।
গত মাসে মুহিতের এক বন্ধু শহর থেকে গ্রামে এসেছে। জিন্স প্যান্টের সাথে কি সুন্দর খয়েরি রঙের এক জোড়া জুতা পরে আছে। বারবার মুহিত সেই জুতার দিকে তাকাচ্ছে দেখে শহরের বন্ধু বলল, এটা অ্যাপেক্স ব্র্যান্ডের শো-রুম থেকে কেনা, বাজারে নতুন এসেছে। মুহিত দাম জিজ্ঞেস করেনি। ভাবলো বেশি হলে ৮০০-৯০০ টাকা হবে। মুহিত ৩০০-৪০০ টাকার বেশি দামের জুতা কখনোই পরেনি। বন্ধুর পায়ে এত সুন্দর জুতা দেখে মনে মনে সাজাতে লাগলো ঐ রকম এক জোড়া জুতা কিনবে। তারপর পায়ে দিয়ে হাঁটবে, সাথে জিন্স প্যান্ট আর টি-শার্ট। তাকে দেখতে কী দারুণ লাগবে। ভেবে পুলকিত হয় মুহিত। গ্রামের বন্ধুরা পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকবে। কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবে- অ্যাপেক্স ব্র্যান্ডের, বাজারে নতুন, অনেক দামি। সে কি আনন্দময় স্বপ্ন।
বাবাকে বলে রেখেছে আগামী মাসে জুতা কিনবে। এটা আর পরা যায় না, পুরনো তালি দেয়া। মুহিত জানে বাবার সীমিত আয় বেশি হলে ৩০০ টাকা দেবেন। মায়ের কাছে বলে ১০০ টাকা নেয়া যাবে। পাশের বাড়ির এক চাচাতো ভাইকে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেছে মুহিত। চাচী কম দিলেও ৩০০ টাকা দেবেন। আরো ১০০ টাকা এদিক ওদিক থেকে জোগাড় হয়ে যাবে। প্রতিদিন প্রাইভেট, নিজের পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে বাবাকে সংসারের কাজে সহযোগিতা করে মুহিত। ক্যালেন্ডারে দিন গুনে আর ভাবে কিছুদিন পর আমিও দামি জুতা পরে হাঁটবো।
মাস শেষে বাবা দিলেন ৩০০ টাকা, মায়ের কাছ থেকে ৫০ টাকা আর চাচী দিলেন ৪০০ টাকা। এক বন্ধুর কাছ থেকে ঋণ করলো ৫০ টাকা। মোট ৮০০ টাকা নিয়ে অন্য এক চাচাতো ভাইসহ থানা সদরে গেলো দামি জুতা কিনতে। দুইজন এই দোকান, ঐ দোকানে যায় কিন্তু কোন জুতা কেনার মিল করতে পারছে না। অনেক খোঁজাখুঁজির পর অ্যাপেক্সের দোকান দেখে মুহিতের চোখ বড় হয়ে গেলো। জুতা কিনতে এতো বড় দোকানে কখনো যায়নি মুহিত। মুহিত ভাবতো ঐ সব বড় বড় দোকান বড় লোকদের জন্য। বড়লোকের অনেক টাকা আছে, তাই তারা দামি জুতা পরে। আজ মুহিতের নিজের কাছে কেন যেন বড় লাগছে। এত বড় দোকানে এসেছে জুতা কিনতে। খুঁজতে গিয়ে পেয়ে যায় ঐ স্বপ্নের প্রিয় জুতা। এটাই কিনবে মুহিত। জুতার গায়ে দাম  লেখা আছে ৮৫০ টাকা। মুহিতের চোখ খুশিতে বড় হয়ে উঠলো। মনের ভেতর আনন্দের ঢেউ খেলে গেলো। ৮৫০ টাকার জুতা দোকানিকে বলে ৭০০ টাকা দিয়ে কিনতে পারবে। বাড়ি থেকে আসতে ৫০ টাকা খরচ হয়েছে। যেতে লাগবে ৫০ টাকা। আর ৭০০ টাকা জুতা। দোকানি মুহিতকে নরম সোফায় বসিয়ে নিজ হাতে পায়ে জুতা পরিয়ে বলল, আয়নায় দেখেন কেমন দেখাচ্ছে। মুহিত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, দাম কত?
দোকানি বলল, ৮৫০ টাকা।
মুহিত দোকানির চোখে তাকিয়ে বলল, ৭০০ টাকা দেয়া যাবে না?
এগুলো সব একদামের জুতা- দোকানি বললো। এখানে কেউ দামাদামি করে না। গায়ে যে দাম  লেখা আছে তা-ই দিতে হবে।
মুহিত মনে মনে ভাবে- আরো ৫০ টাকা বলি, প্রয়োজনে দু’জন হেঁটে বাড়ি যাবো।
মুহিত বলল, ভাই আরো ৫০ টাকা  দেবো।
দোকানি কিছুটা বিরক্ত হলো এবং বলল, না হবে না, একদাম, অন্যটা দেখেন।
হঠাৎ করে মুহিতের মনটা বিষণ্ন হয়ে গেলে। যদি আর ১০০ টাকা থাকতো তাহলে জুতা কিনতে পারত। চাচাতো ভাইয়ের কাছে ৩০ টাকা আছে। মুহিতের থানা সদরে পরিচিত কেউ নেই যে, তার কাছ থেকে টাকা চেয়ে  নেবে। অ্যাপেক্স শো-রুম থেকে বের হয়ে মুহিত বলল, চল বাড়ি যাই, আজ আর জুতা কিনবো না। চাচাতো ভাই বলল, চল অন্য দোকানে ৭০০ টাকার মধ্যে একজোড়া কিনে নিই।
মুহিত গম্ভীর হয়ে বলল, আজ আর জুতা-ই কিনবো না, বাড়ি চল। দু’জন বাড়ির পথে পা বাড়ালো। মুহিতের অজান্তেই মুহিতের চোখে ১০০ টাকার জন্য জুতা কেনার স্বপ্ন অশ্রু হয়ে ঝরে পড়তে লাগল।
খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা) আবু দারদাকে (রা) সিরিয়ার গভর্নর নিয়োগের প্রস্তাব দিলে তিনি সে প্রস্তাব বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। তাকে রাজি করানো কঠিন হয়ে পড়ে। খলিফা এ প্রস্তাবের ওপর অনুরোধের চাপ সৃষ্টি করলে তিনি শর্তসাপেক্ষে রাজি হলেন এবং বললেন : আমাকে যদি কুরআন ও হাদিস শরিফের শিক্ষা প্রদানসহ নামাজে ইমামতি করার অনুমতি দেন, তবেই আমি এ দায়িত্ব পালন করতে পারি। হজরত ওমর (রা) এ শর্ত তিনটি মেনে নিলেন। তারপর আবু দারদা (রা) সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের উদ্দেশে রওনা হন।
আবু দারদা (রা) সিরিয়ার গভর্নর থাকাকালীন সময়ে খলিফা ওমর (রা) গোপনে তাঁর অবস্থা জানার জন্য এক রাতের আঁধারে গভর্নর আবু দারদার বাড়িতে পৌঁছে তার ঘরের দরজার কড়া নাড়লেন। ঘরের দরজা খোলা পেয়ে ওমর ফারুক (রা) অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়লেন। আবু দারদা তার প্রবেশ আঁচ করে উঠে দাঁড়িয়ে দেখেন ওমর (রা)। তাঁকে খোশআমদেদ জানিয়ে বসতে বললেন। মুসলিমবিশ্বের দুই মহান নেতা রাতের অন্ধকারেই একান্ত পরিবেশে পারস্পরিক আলোচনায় নিমগ্ন হয়ে পড়লেন।
আবু দারদার (রা) ঘরে কুপি জ্বালানোর মতো তেল না থাকায় রাতের আঁধারে তাঁরা একে অপরকে দেখতে পাচ্ছিলেন না। এ গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ফাঁকে ওমর (রা) দারদার বালিশটি কেমন আরামদায়ক, না সাধারণ তা হাত বাড়িয়ে দেখেন। তিনি দেখতে পান যে, আবু দারদা তাঁর ঘোড়ার পিঠে ব্যবহৃত কাপড়টিকেই রাত্রিবেলা বালিশ হিসেবে ব্যবহার করছেন।
ওমর ফারুক এবার আবু দারদার বিছানার অবস্থা কেমন তা হাত বাড়িয়ে দেখার চেষ্টা করেন। দেখেন গুঁড়ো পাথর মিশ্রিত বালি সমতল করে নিয়ে তাকেই তিনি বিছানা বানিয়েছেন। এবার খলিফা ওমর (রা) আবু দারদার লেপ-তোশকের খবর নিতে লাগলেন। দেখতে পেলেন যে, লেপ-তোশক বা কম্বল ইত্যাদি বলতে পাথর কণার বিছানায় একটি মাত্র পাতলা কম্বল যা দামেস্কের প্রচন্ড শীত প্রতিরোধে মোটেই উপযোগী নয়।
এসব দেখে তিনি আবু দারদাকে বললেন, আমি কি আপনার প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য বায়তুলমাল থেকে উপযুক্ত ভাতার ব্যবস্থা করিনি? আমি কি আপনার মাসিক ভাতা যথাসময়ে আপনার কাছে প্রেরণ করিনি?
আপনার এ দুরবস্থায় আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক।
আবু দারদা (রা) উত্তর দিলেন, হে খলিফাতুল মুসলিমিন, রাসূল (সা) এর সেই হাদিসটি কি আপনার মনে পড়ে, যা রাসূল (সা) আমাদের শুনিয়েছিলেন?
ওমর (রা) বললেন, কোনটি?
রাসূল (সা) কি আমাদের বলেননি? দুনিয়াতে যাদের ধন সম্পদ ও অর্থকড়ি যেনো একজন মুসাফিরের সরঞ্জামাদির চেয়ে বেশি না হয়।
তিনি আরো বললেন, হে খলিফাতুল মুসলিমিন, এ সত্ত্বেও আমরা কী করছি?
ছেলেটি ভ্যান চালায়। গায়ের রঙ তামাটে। কোঁকড়ানো ছোট ছোট চুল। দেখলে মনে হবে যেন আফ্রিকান নিগ্রো। নাক চ্যাপ্টা। বয়স এগারো পেরোয়নি। প্রায় প্রতিদিন ওর সাথে আমার দেখা হয়। অফিসে যাতায়াতের পথে। বাস থেকে নামলেই ছুটে আসে আমাকে নেয়ার জন্য। ও জানে আমি ঠিক কোন সময় বাস থেকে নামি। তবে প্রতিদিন যে ওর সাথে দেখা হয় তা নয়। ও থাকলে আমি আর অন্য কারো ভ্যানে উঠি না। ওর প্রতি যেন একটু আলাদা মায়া পড়ে গেছে। ছেলেটির নাম করিম।
আমাদের মফস্বল শহর সাতক্ষীরা। আগে এখানে প্রচুর রিক্সা চলত শহরের রাস্তায়। এখন আর রিক্সা নেই বললেই চলে। হঠাৎ দু-একটা চোখে পড়ে। রিক্সার ভাড়া বেশি। তাই তেমন যাত্রী মেলে না। সবাই ভ্যানে চড়তে চায়। তাই রিক্সা চালকরা এখন রিক্সা ছেড়ে দিয়ে ভ্যান নিয়ে রাস্তায় নেমেছে।
একদিন করিমের ভ্যানে বসে ওর কথা শুনলাম। বাড়ি শ্যামনগরের বংশীপুরে। বাবাকে সুন্দরবনের বাঘে খেয়েছে দেড় দুই বছর হলো। বাবা ছিলেন মৌয়াল। প্রতি বছর সুন্দরবনে ফরেস্টার অফিসের পাশ নিয়ে মৌয়ালদের দলে মধুর চাক ভাঙতে যেতো। বড় নৌকায় জঙ্গলের ভেতরের নদীতে নৌকায় থাকত মৌয়ালদের দল। এক মাস কিংবা তারও বেশি। তার পর মধুর চাক ভাঙা শেষ হলে ওরা বাড়ি ফিরে আসত। মধু বিক্রি করে যা আয় হতো তাতে ওদের মা-বাবা আর ছোটবোনের অভাবের সংসারটা চলে যেতো কোনো রকম।
করিমের বয়স তখন নয়। তখন ক্লাস থ্রিতে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে। অন্য বছরের ন্যায় সেবারও মৌয়ালের দলে গেল সুন্দর বনে মধু আহরণে করিমের বাবা। একজন মৌয়াল, থাকে নৌকায় রান্নাবান্নার কাজে। আর বাকিরা চাকের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে। সবাই সন্তর্পণে চারিদিকে চোখ রেখে এগোতে থাকে বনের ভেতর। মৌমাছিদের উড়ে যাওয়া দেখে চাকের সন্ধান মিললেই তবে না মধুর চাক ভাঙা। করিমের বাবা শুকুর আলী কয়টা মৌচাকের গতিপথে উড়ে যাওয়ার দিকে চোখ রেখে এগোতে থাকে। আর তখনই এলো একটি বাঘ। হঠাৎ রয়েল বেঙ্গল টাইগারটি পড়লো শুকুর আলীর ওপরে। ঘাড়ে দাঁত বসিয়ে ওকে নিয়ে গেলো জঙ্গলের গহিনে। ওর সঙ্গীরা লাঠিসোটা ও বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করেও তাকে ছাড়িয়ে নিতে পারলো না। তারপর তিন-চারদিন খোঁজাখুঁজির পর পেল ছিন্ন ভিন্ন লাশ। করিমের মার চোখে তখন অমাবস্যার অন্ধকার। ওদের দুই ভাই বোনের চোখে শ্রাবণের ধারা। মা সংসারের হাল ধরতে নদীতে নামলেন। নদীতে কোমর পানিতে নেমে জাল ঠেলে গলদা চিংড়ির রেণু ধরে বিক্রি করে দু’মুঠো ভাতের জোগাড় করতে লাগলেন। তাতে দিন চলে না। করিমকে তাই স্কুল ছাড়তে হলো। করিমের এক দূর সম্পর্কের চাচার বাসায় থেকে এসে ভ্যান চালাতে লাগলো সাতক্ষীরায়, ছোট বোনটি তখন সবে স্কুলে ভর্তি হয়েছে।
দিন যায় মাস যায়। এই ভাবে দিন গড়িয়ে বছর গড়িয়ে গেলো করিমের ভ্যান চালানোয়। আর যা আয় হয় ভ্যান মালিকের রোজকার ভাড়া শোধ করে বাকি টাকা চাচার কাছে জমা রাখে। মাস পুরো গেলে মার কাছে টাকা পাঠায় করিম। চাচার সংসারে আছে। থাকা খাওয়ার খরচ নেই। এই ভাবে চলছে করিমের।
সেবার ঈদে লম্বা ছুটি পড়ে গেল অফিসের। সেই সঙ্গে আমারও কিছু কাজের জন্য আরো কত দিন ছুটি বাড়িয়ে নিলাম। সব মিলে প্রায় দিন পনেরো হবে। করিমের সঙ্গে ক’দিন আর দেখা নেই। এবার ছুটি ফুরালো। এবার অফিসে আসার পালা। বাস থেকে নেমে আর আগের মতো করিমের দেখা পেলাম না। অবাক হয়ে এ দিক চোখ বুলালেও কোনো লাভ হলো না। ভাবলাম আমার ছুটির কারণে এই সময়টা আমার জন্য অপেক্ষা না করে অন্য কোন যাত্রী নিয়ে চলে গেছে।
একদিন দু’দিন করে প্রায় মাস পেরুল, কিন্তু করিমের আর দেখা পাই না। শেষে কয়েকজন ভ্যান চালককেও করিমের কথা জানতে চেয়েও লাভ হলো না। কিন্তু তারাও কোন কিছু বলতে পারলো না। মনে মনে ভাবলাম, করিম হয়তো ফিরে গেছে তার গ্রামে। মনটা খচখচ করতে লাগলো বেচারি ছেলেটার জন্য। ওর গ্রামে গেলে হয়তো খোঁজ পাওয়া যাবে। ভাবলাম একদিন ছুটির দিনে ওর গ্রামে যেয়ে খোঁজখবর নিয়ে আসবো। ওকে পেলে আমার ভালো লাগবে। যাবো যাবো করেও আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। আস্তে আস্তে করিমের কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। কর্মব্যস্ততার মাঝে সময় কখন পাড়ি দিয়েছে ঠিক পাইনি। প্রতিদিন মুয়াজ্জিনের ফজরের আজানে ঘুম ভাঙে। আর তখন থেকে শুরু হয়ে যায় ব্যস্ততা সারা দিনের কর্মক্লান্ত অবসন্ন শরীরে রাতে বাড়ি এলেই চোখের পাতায় নেমে আসে ঘুম। কখন নিশাচর পাখিরা ডেকে যায়। কখন শিয়ালের প্রহর পেরুনোর হুক্কা হুয়া শেষ হয়। কখন আরো সন্ধের জোনাকির মিটি মিটি আলো শেষ হয় কিছুই বলতে পারি না।
একদিন বিকেল। বাসায় যাওয়ার জন্য একটু আগেই অফিস থেকে বেরিয়েছি। তখন আমার বাসে ওঠার রাস্তার পাশে পলাশপোল স্কুলের ছুটি হয়েছে। ছাত্রদের ভিড় রাস্তায়। কেউ ভ্যানে উঠছে, কেউ হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ সামনের একটি ছেলেকে দেখলাম আমার ভ্যানের দিকে এগিয়ে আসতে। ঠিক যেন সেই করিমের মতো। আমি মনে করলাম হয়তো অন্য কেউ হবে। ও আমাকে দেখেই মুচকি হেসে বলল; স্যার ভালো আছেন। আমি অবাক। করিম নিজেই বলল; চাচা আমাকে এই স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। আমি ভ্যান থেকে নেমে করিমকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। মনটা আমার আনন্দে ভরে গেল। মনে হলো নিদারুণ বৃষ্টির পর মেঘের কোলে এক পসলা রোদ্দুরের দেখা পেলাম।
গত সংখ্যার পর
৭.
অবশেষে সন্ধির একটি চুক্তিনামা তৈরি হলো। লিখিত এ চুক্তিটিই হোদায়বিয়ার চুক্তি নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। এই চুক্তিপত্রে মুসলমানদের পক্ষে প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা) এবং কাফিরদের পক্ষে সাহিল বিন উমরু স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তিপত্রে লেখা ছিল কুরাইশ সম্প্রদায় এবং মুসলমানরা আগামী দশ বছর এই চুক্তিবলে যুদ্ধবিগ্রহে জড়িয়ে পড়বে না। এ বছর মুসলমানরা ওমরা না করেই ফিরে যাবে, আগামী বছর তারা ওমরা হজ করার জন্য আসতে পারবে, তবে তিন দিনের বেশি মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না।
চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের সাথে খালিদও উপস্থিত ছিল। সে অপলক চোখে তাকিয়েছিল মুহাম্মদ (সা)-এর চেহারা মোবারকের দিকে। কী অনিন্দ্যসুন্দর চেহারা, কী প্রশান্ত অবয়ব, কী মায়াময় চোখ। খালিদের মনে হচ্ছিল, মুহাম্মদের কণ্ঠ থেকে যেন ঝরে পড়ছে মধুমাখা বাণী। চকিতে তার মনে উদয় হয়েছিল, এই লোক তো জগতের ভালোবাসা কাড়তেই দুনিয়ায় এসেছে। এমন মিষ্টি চেহারা আর মধুমাখা বাণী যার কণ্ঠে তাকেই কিনা তারা হত্যা করতে চায়! খালিদ অপ্রস্তুত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছিল নিজের বংশগৌরবের কথা চিন্তা করে।
খালিদ আবার তাকালো নবীর চেহারা মোবারকে। এ দৃষ্টি একজন সৈনিকের দৃষ্টি, সেনাপতির দৃষ্টি। যে চেহারাজুড়ে মায়া-মমতার প্রলেপ সেখানেই খেলা করছে সাহস ও দৃঢ়তার এক অনন্য প্রচ্ছদ। খালিদের মনে হলো, তার চেহারা মুবারক থেকে ছিটকে পড়ছে প্রদীপ্ত পৌরুষ, যাকে দেখলে আপনাতেই শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে মস্তক অবনত হয়ে যেতে চায়। খালিদ জোর করেই সেখান থেকে তার দৃষ্টি সরিয়ে নিতে চাইল। তার মনে পড়ে গেল মহানবীর (সা) অনন্য রণকৌশল ও যুদ্ধনীতির কথা। একজন দক্ষ সেনাপতির যা যা গুণ দরকার তার সবটাই যেন জমা হয়ে আছে এ লোকের অঙ্গে। হোদায়বিয়ার মজলিসে বসেই খালিদ হিসাব করলো মুসলমানদের সঙ্গে তাদের কয়টা যুদ্ধ হয়েছে। হিসাব করে দেখলো মুহাম্মদের নেতৃত্বে এ পর্যন্ত মুসলমানরা তাদের বিরুদ্ধে আটাশটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। আর কি আশ্চর্য, প্রতিটি যুদ্ধেই বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে সে। অথচ যুদ্ধ করার কোনো পরিকল্পনাই সে করেনি। আমরাই আমাদের পছন্দমতো সময়ে, পছন্দমতো জায়গায় তাকে যুদ্ধে টেনে এনেছি। আমরা আমাদের পরিকল্পনামত যতবার তাকে যুদ্ধে জড়িয়েছি ততবারই সে আমাদের পরাজিত করেছে। আমরা যতই তাকে দুর্বল করতে চেয়েছি ততই দুর্বল না হয়ে আরো সবল হয়েছে।
হোদায়বিয়ার সন্ধির ঘটনা খালিদের মনে খুব বড় রকমের একটি দাগ এঁকে যায়। এতদিন ধর্ম সম্পর্কে কোনো কিছু ভেবে দেখেনি খালিদ। সন্ধির পর ওমরা না করেই মুসলমানরা ফিরে গেলে সে ভাবতে থাকে, ধর্ম কী? মানুষের জীবনে ধর্মের প্রয়োজন কী?
হোদায়বিয়ার সন্ধির পর দুই মাস কেটে গেছে। এই দুই মাসে খালিদ নীরবে অনেক ভেবেছে, অনেক কিছু চিন্তা করেছে। চিন্তা করতে গিয়েই সে নিজের মধ্যে এক ধরনের পরিবর্তন অনুভব করতে শুরু করে। ধর্মের ব্যাপারে খালিদের কোনোদিন কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু ইদানীং তার ধ্যান-ধারণায় সারাক্ষণ ধর্ম বিষয়টা কাজ করতে থাকে। সে এই চিন্তায় হারিয়ে যায়, মানুষের জীবনে ধর্মের কাজ কী? ধর্মের প্রয়োজনই বা কী? এই যে নানা ধর্মমতের মধ্যে কোনোটি সত্য ধর্ম?
‘আকরামা।’ একদিন খালিদ তার বন্ধু সেনাপতি আকরামাকে বলল, ‘আমি বুঝতে পেরেছি এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি…।’
‘কী বুঝতে পেরেছো?’ আকরামা জানতে চায়।
‘মুহাম্মদ কোনো জাদুকর নয়।’ খালিদ বলল, ‘আর সে কোনো কবিও নয়। সে সত্যি সত্যি আল্লাহর রাসূল। আমি তাকে হোদায়বিয়ার সন্ধির সময় ভালোভাবে লক্ষ্য করেছি। তখনই মনে হয়েছে, তাকে শত্রু মনে করাটা ঠিক নয়। তাকে যতই দেখেছি ততই মনে হয়েছে, সে এক মহামানব। তার প্রতি আমার এক ধরনের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা আপনাতেই তৈরি হয়ে গেছে। সে যা বলে, যা করে তা কোনো মহামানবের পক্ষেই সম্ভব।’
‘হোবল ও উজ্জার কসম! তুমি ঠাট্টা করছো।’ আকরামা বলল, ‘কেউ বিশ্বাস করবে না, ওয়ালিদের বেটা নিজ ধর্ম ত্যাগ করেছে।’
‘না, প্রকাশ্যে আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করিনি বটে, তবে আমার অন্তর মুহাম্মদ ও তার ধর্মকে ভালোবাসতে শুরু করেছে।’ বলল খালিদ।
‘তুমি কি ভুলে গেছো, মুহাম্মদ আমাদের কত লোককে হত্যা করেছে?’ আকরামা বলল, ‘যাকে তোমার অন্তর ভালোবাসতে শুরু করেছে তার কাছে আমাদের বহু রক্ত পাওনা। আমাদের যেসব মায়ের বুক সে খালি করেছে তার প্রতিশোধ নেয়ার দায়িত্ব এ জাতি আমাদের কাঁধেই অর্পণ করেছে। তুমি কি তোমার দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাও?’
‘কেন সে আমাদের রক্ত নিয়েছে? সে কি কখনো রক্ত নিতে চেয়েছে? আমরাই তাকে রক্ত নিতে বাধ্য করেছি। আমরা তাকে বারবার হত্যা করতে চেয়েছি, আর সে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের রক্ত নিয়েছে। তুমিই বলো, সে আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে, নাকি আমরা তার ওপর যুদ্ধ চাপিয়েছি? সে কি আত্মরক্ষার চেষ্টাও করতে পারবে না?’
‘দেখো খালিদ, আমরা তাকে যথেষ্ট মান্য করতাম। আমরাই তাকে আল আমিন উপাধি দিয়েছিলাম। কিন্তু সে আমাদের বাপ-দাদাদের ধর্ম অস্বীকার করে নতুন ধর্ম প্রবর্তন করতে গিয়ে নিজেই আমাদের শত্রুতা ক্রয় করে নিয়েছে।’
‘কোন ধর্মের কথা বলছো তুমি? যে ধর্ম দুর্বলের প্রতি অত্যাচার করতে বাধা দেয় না, যে ধর্ম মায়ের জাতকে মানুষ মনে করে না, পরের সম্পদ লুণ্ঠন করার মাঝে কোনো অন্যায় দেখতে পায় না, প্রতিহিংসা উসকে দেয়, তা কি কোনো ধর্ম হতে পারে? মানুষে মানুষে ঘৃণা ও হিংসা যে প্রতিরোধ করতে পারে না তা মানবধর্ম হতে পারে না। মুহাম্মদ তো শুধু এটুকুই দাবি করেছে, এক আল্লাহর ইবাদাত করো আর মানুষকে শত্রু না ভেবে তাকে ভাই বলে বুকে জড়িয়ে ধরো। তাকে তো কখনো অন্যায্য কথা বলতে শুনিনি।’
আকরামা বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে খালিদের দিকে। বলে, ‘খালিদ, তুমি কি বলছো বুঝতে পারছো? গরিব ও অসহায় মানুষজন তাদের আশ্রয় ভেবে মুহাম্মদের দলে যোগ দিচ্ছে। তোমার কিসের অভাব? তুমি কেন মুহাম্মদের দলে যোগ দেবে?’
‘আমি কি বলছি তা আমি জানি। আকরামা, আমি খুব ভেবেচিন্তেই এ কথা বলছি। জাতি আমাদের হাতে অস্ত্র দিয়েছে। সে অস্ত্র দিয়ে আমরা কী করছি? আমরা ধনীদের স্বার্থ রক্ষা করছি। যার ক্ষমতা নেই, যে অসহায় তাকে রক্ষার কথা আমরা ভাবি না। এটা অন্যায়। আমরা লড়ছি অন্যায়ের পক্ষে, মুহাম্মদ আমাদেরকে এ অন্যায় পথ পরিহার করতে বলছে। আমরা হৃদয়হীন। মুহাম্মদ নির্দয়তা ছেড়ে ভালোবাসার কথা বলছে। আমরা দুর্বলের সঙ্গে পশুর মতো আচরণ করি। মুহাম্মদ আমাদেরকে পাশবিকতা ছেড়ে মানবিকতার পথে চলতে বলছে। বলো, ডাক পাওয়ার পরও কি আমি মানবিকতার পথে পা বাড়াবো না?’
সেদিনই সন্ধ্যায় আবু সুফিয়ান ডেকে পাঠাল খালিদকে। খালিদ দেখলো সেখানে আকরামাও বসা। খালিদ কামরায় ঢুকেই টের পেলো আবু সুফিয়ানের চেহারা রাগে ও গোস্বায় ভরা। বলল, ‘আপনি আমায় ডেকে পাঠিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ।’ আবু সুফিয়ান বলল, ‘খালিদ, শেষে তুমিও কি মুহাম্মদের জাদুর খপ্পরে পড়ে গেলে?’
খালিদ বসতে বসতে বলল, ‘আপনি ঠিকই শুনেছেন। মুহাম্মদের জাদু আমার আত্মাকে বশ করে ফেলেছে। অসহায় মানুষের ক্রন্দনধ্বনি আমার আত্মাকে বলছে, হে ওয়ালিদের বেটা, তোমার অস্ত্র কি আমাদের শাহরগ কাটার জন্য, নাকি আমাদের রক্ষার জন্য? আমি অসহায় মানুষের কান্নায় সাড়া দিতে চাই।’
আবু সুফিয়ানের চেহারা রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করলো। সে খালিদকে বলল, ‘ওয়ালিদের বেটা, তোমাকে আমরা সেনাপতি বানিয়েছি। তোমার দায়িত্ব আমাদের হেফাজত করা এবং আমাদের শত্রুদের নিধন করা। তুমি যদি শত্রুনিধনের পরিবর্তে তাদের সাহায্যকারী হয়ে যাও তবে তোমাকে সেনাপতির পদ থেকে বরখাস্ত করা ছাড়া আমার উপায় থাকবে না।’
‘আবু সুফিয়ান।’ খালিদ বলল, ‘তুমি আমাকে বরখাস্ত করার ভয় দেখিও না। আমি তোমার হুমকি ধমকির তোয়াক্কা করি না। হুমকি ধমকি দিয়ে তুমি আমার চিত্তের আকাক্সক্ষা বন্ধ করতে পারবে না।’
প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক আল ওয়াকিদি লিখেছেন, ‘তাদের আলোচনা ও তর্কবিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, আবু সুফিয়ান খালিদকে হত্যার হুমকি দেয়। খালিদ এ হুমকির জবাবে রাগ না করে হেসে ওঠে, এ হাসিতে ছিল ব্যঙ্গ ও তাচ্ছিল্য। আকরামা যদিও খালিদের মুসলমান হওয়ার বিপক্ষে ছিল, কিন্তু খালিদের সাথে আবু সুফিয়ানের ব্যবহার ও হত্যার হুমকি সে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। সে আবু সুফিয়ানকে বলে, ‘আবু সুফিয়ান, আমি তোমাকে কবিলার সরদার বলে মান্য করি। কিন্তু খালিদকে তুমি যে ধমক দিয়েছো তা আমি সহ্য করতে পারি না। তুমি খালিদের ধর্ম ত্যাগে বাধা দিতে পারো না। আমি তোমাকে স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, তুমি যদি খালিদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাও তরে আমি তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াবো। প্রয়োজনে খালিদের সঙ্গী হয়ে আমিও মদিনায় চলে যাবো।’
পরদিনই মক্কার সর্বত্র এ কথা চাউর হয়ে গেল। সবার মুখে একই প্রশ্ন, একই জিজ্ঞাসা, খালিদ বিন ওয়ালিদ নাকি মদিনায় মুহাম্মদের কাছে চলে যাচ্ছে?’
এ ঘটনা মক্কার জনগণের মধ্যে বড় রকমের আলোড়ন সৃষ্টি করলো। তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়লো। কিন্তু খালিদকে বারণ করার হিম্মত কারো ছিল না। সত্যি সত্যি দেখা গেল, খালিদ মদিনার উদ্দেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছে।
মদিনার পথে রওনা হয়েছে আরবের শ্রেষ্ঠ বীর ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ। তার বুকে বাজছে হাজারো স্মৃতির দামামা। যতই সে মদিনার নিকটবর্তী হচ্ছে ততই অতীত দিনের স্মৃতিরা এসে তার মনের পর্দায় ভিড় জমাচ্ছে। খালিদ হেঁটে নাকি ঘোড়ায় চড়ে এগোচ্ছে সে খেয়ালও তার নেই। সে তার শৈশব ও কৈশোরে দেখা মুহাম্মদ আর হোদায়বিয়ার সন্ধির সময়ে দেখা মুহাম্মদকে  মেলানোর চেষ্টা করছিল। সে পথ চলছিল আর মনে মনে আওড়াচ্ছিল, ‘আমি মানুষ নয়, এক মহামানবের কাছে যাচ্ছি। তিনি যদি আল্লাহর নবী না হন তবে কে আর এমন আছে যিনি আল্লাহর নবী হবেন? নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রাসূল। তাঁর কাছে আল্লাহর অহি না এলে এমন মধুর বাণী তিনি কোথায় পান? তাঁর সাহায্যকারী আল্লাহ না হলে কী করে তিনি মোকাবেলা করছেন সমগ্র আরবের বিরোধিতা? শত অত্যাচার নির্যাতনের পরও যার ঠোঁটে লেগে থাকে অম্লান হাসি, যার চোখ থেকে ঝরে পড়ে ¯েœহ আর প্রেম, তিনি আর কেউ নন, তিনিই মানবতার বন্ধু, আল্লাহর নবী।’
দূর থেকেই খালিদের সামনে মদিনার মিনার ভেসে উঠলো। স্বপ্নের জগৎ থেকে যেন বাস্তবে ফিরে এলো খালিদ। হ্যাঁ ওই তো মদিনা। ওখানেই আছেন দ্বীনের নবী। সে তার ঘোড়া দ্রুত চালানোর জন্য লাগাম টেনে ধরলো। ঘোড়ার পিঠে চাবুক কষতে যাবে এ সময় কেউ যেন দূর থেকে প্রলম্বিত সুরে ডাকলো খা-লি-দ। খালিদ ডানে বায়ে সামনে তাকালো। না, নেই, কেউ কোথাও নেই। তবে ডাকলো কে? খালিদ ভাবলো মনের বিভ্রম। সে ঘোড়ার পিঠে চাবুক হানলো। এ সময় সে আবার শুনতে পেলো সেই ডাক, খা-লি-দ! মনে হলো ডাকটা পেছন থেকে আসছে। সে আবার থেমে গেল এবং ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো। দেখলো দুই অশ্বারোহী তীব্রগতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে তারই দিকে আসছে। এবার পুরোপুরি থেমে গেল খালিদ। আগন্তুকরা না পৌঁছা পর্যন্ত ওখানেই অপেক্ষা করলো। আগন্তুকরা ঘোড়া এনে দাঁড় করালো খালিদের পাশে।
‘তোমরা দুইজন কি আমাকে মক্কা ফিরিয়ে নিতে এসেছো?’ জিজ্ঞাসু চোখে ওদের দিকে তাকালো খালিদ।
‘তুমি কোথায় যাচ্ছো?’ জানতে চাইল ওমর বিন আস।
‘তোমরা তো দেখতেই পাচ্ছো আমি কোথায় যাচ্ছি। কিন্তু তোমরা কোথায় যাচ্ছো?’ বলল খালিদ।
‘খোদার কসম, আমরা কোথায় যাচ্ছি বললে তুমি আবার রেগে যাবে না তো?’ বলল ওসমান বিন তালহা।
‘কেন, আমি রাগলে তোমরা সত্য প্রকাশ করবে না? কোথায় যাচ্ছো এটা বলার মতো সাহসও কি তোমাদের নেই।’
‘অবশ্যই আছে। আমরা দু’জন মদিনা যাচ্ছি। আমরা ঠিক করেছি, আমরা ইসলাম গ্রহণ করবো।’ ওসমান বি তালহা নির্ভীককণ্ঠে জবাব দিলো।
ওমর বিন আস বললো, ‘হ্যাঁ খালিদ, আমরা দু’জনই মুহাম্মদের দ্বীন গ্রহণ করতে চলেছি।’ বলল ওমর বিন আস।
‘তবে তো আমরা একই পথের যাত্রী।’ খালিদ হাত বড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘চলো এক সাথেই যাই।’
ওমর এবং ওসমান দু’জনই তার হাত নিজেদের মুঠোয় নিয়ে বলল, ‘চলো।’
৬২৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মে। আরবের দুই প্রসিদ্ধ জেনারেল খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং ওমর বিন আস একই সাথে রাসূলের (সা) দরবারে গিয়ে হাজির হলো, তাদের সঙ্গে ওসমান বিন তালহা। প্রথমেই কামরায় ঢুকলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ, তার পেছনে ওমর বিন আস এবং সবার শেষে ওসমান বিন তালহা। তিনজনই রাসূলকে জানালেন তাদের ইচ্ছার কথা। রাসূল (সা) উঠে দাঁড়ালেন এবং একে একে সবার সাথে কোলাকুলি করলেন। এরপর ঘটলো সেই অবিস্মরণীয় ঘটনা। রাসূল (সা)-এর সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে সবাই পড়লেন, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর প্রেরিত নবী ও রাসূল।
গত সংখ্যার পর
৭.
সন্ধ্যার পর বাংলো থেকে বের হলো অয়ন, ফাহাদ আর মাহি। ট্রলারে বসেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে গবেষকের বাড়ির ওপর আজ থেকেই নজর রাখবে। কঅ ঘটে ও বাড়িতে, কারা আসে যায় সব কিছু দেখা চাই। ব্যাগ থেকে বের করে কিছু জিনিসপত্র সাথে নিলো অয়ন। বেড়াতে গেলে টর্চলাইট, ছোট চাকু, বাইনোকুলারসহ কিছু সামগ্রী সব সময় সঙ্গে রাখে ও। রুমে তালা দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো। সালাম মিয়া ও অয়নের আব্বুর বাসায় ফিরতে আরও রাত হবে আগেই বলে গেছে। বাইরে অন্ধকার খুব গাঢ় নয়, আবার ঝকঝকে জোছনাও নেই। পরিবেশটা সুবিধাজনক হওয়ায় স্রষ্টাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিল অয়ন। হেঁটে এসে গবেষকের বাড়ির সামনে না থেমে পার হয়ে আরও সামনে গেল। পঞ্চাশ গজের মত সামনে গিয়ে একটি গাছের ছায়া দেখে দাঁড়িয়ে পড়লো। জায়গাটা গাছের ছায়া থাকার কারণে একটু বেশিই অন্ধকার লাগছে। দূর থেকে কারও চোখে পড়ার সম্ভাবনা নেই। গবেষকের বাড়ির দিকে তাকালো অয়ন। সামনের ঘরটা অন্ধকার, ভেতরের ঘরে সৌর বিদ্যুতের আলো জ্বলছে। সঙ্গীদের কাজ বুঝিয়ে দিল অয়ন। প্রয়োজনীয় মুহূর্তের জন্য কিছু সঙ্কেতও শিখিয়ে দিল। সিদ্ধান্ত হলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফাহাদ আর মাহি সামনের অংশে নজর রাখবে আর অয়ন পেছনের দিকটা দেখার চেষ্টা করবে। সম্ভব হলে ঘরের কাছাকাছি যাবে।
ওদেরকে দাঁড়ানোর জায়গা দেখিয়ে দিয়ে অয়ন রাস্তা থেকে নেমে গেল। বাড়িটার দক্ষিণ পাশটা ফাঁকা জায়গা। তবে মাটি ভরাট করা। হয়তো কেউ কিনে ভরাট করে রেখেছে বাড়ি করার জন্য। দেয়ালের পাশ ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করলো অয়ন। উঁকি দিয়ে দেখলো দেয়ালের ভেতরে প্রায় পাঁচ ছয় হাত ফাঁকা জায়গা তারপর ঘর। ফাঁকা জায়গায় দু-একটা ছোট ফলের গাছ আছে। প্রয়োজনে ওগুলোর আড়াল ব্যবহার করা যেতে পারে বলে ভেবে রাখলো। হঠাৎ বাড়ির সামনের বারান্দায় আলো জ্বলে উঠলো। একটু থামলো অয়ন। কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খোলার শব্দ পেল। শরীর নিচু করে চেয়ে রইলো নিঃশব্দে। দরজা দিয়ে বের হলো একটা ছায়া মূর্তি। আবার দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। লাভলুকে চিনতে পারলো অয়ন। ঘর থেকে বের হয়ে সোজা হেঁটে রাস্তায় উঠলো। রাস্তায় উঠে দক্ষিণ দিকে যেতে লাগলো, হাতে টর্চলাইট। অয়নের কপালে ভাঁজ পড়লো। আর বিশ পা হাঁটলেই লাভলু পৌঁছে যাবে ফাহাদ আর মাহির কাছে। ওরা কি করছে এখন? সময়মতো লুকাতে না পারলে ধরা পড়ে যাবে। লাভলুকে সেই জায়গাটা পার হয়ে যেতে দেখলো অয়ন। সবকিছু স্বাভাবিক তাই কোন ভুল হয়নি বোঝাই যায়। আধা মিনিট পর একটা পাখির ছোট্ট ডাক শুনলো রাস্তা থেকে। কণ্ঠটা মাহির। অর্থাৎ ওকে ডাকছে। চলে এলো অয়ন রাস্তায়। অয়নকে দেখে রাস্তার পাশের ঝোপে আড়াল থেকে চুপিসারে বেরিয়ে এলো। ইশারায় সবকিছু ঠিক আছে কি না জিজ্ঞেস করলো অয়ন। তারপর লাভলু যেদিকে গেছে সেদিকে পা বাড়ালো।
এই সময় লাভলু অনেকটাই এগিয়ে গেছে। তবে হাতে লাইট থাকার কারণে ওরা ওকে হারালো না। চুপিসারে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে চললো পেছন পেছন। রাস্তাঘাটে ওরা ছাড়া আর কোন লোক নেই। দ্বীপে আটটা মানে অনেক রাত। ট্রলার ঘাটের পথ ধরলো লাভলু। আবাসিক হোটেলগুলোর রুমে রুমে লাইট জ্বলছে, কয়েকজন টুরিস্ট বাইরে বের হয়ে গল্প করছে। একটি চায়ের দোকানে হারিকেনের আলোয় দু’তিনজন দ্বীপের বাসিন্দা বসে আছে। একপাশ ঘেঁষে চুপচাপ চলে এলো ওরা। কেউ দেখলো বলে মনে হলো না। ট্রলার ঘাটের কাছাকাছি এসে লাভলু টর্চলাইট জ্বাললো না আর। দূর থেকে নজর রাখতে এবার সমস্যায় পড়লো অয়নরা। তবু চুপচাপ হাঁটতে লাগলো। এখনও অন্ধকারে একটি ছায়ামূর্তির মত দেখা যাচ্ছে; কিন্তু ঘাটের গাছপালা বেষ্টিত জায়গায় গেলে আর দেখতে পারবে না। তবু এগোতে থাকলো ওরা। আয়ন আশায় আছে টর্চ যেহেতু হাতে আছে মাঝে মধ্যে জ্বালবেই। ঘাটের কাছাকাছি এসে একটা বড় গাছের আড়ালে দাঁড়ালো তিনজন। ঘাট তখন প্রায় একশো গজ সামনে। এবার অয়নের ধারণাই সত্যি হলো। লাইট জ্বাললো লাভলু। প্রথমে মাটির দিকে লাইটের আলো ফেললো এরপর হাত দিয়ে টর্চের মুখ চেপে ধরলো। একই কাজ পরপর দুবার করলো। এরপর আবার অন্ধকার। ঘাটে একটি মাত্র ট্রলার ভিড়ে আছে, তবে কোন লোকজন নেই। একা লাভলু সমুদ্রের দিকে মুখ করে চেয়ে আছে। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলো ওরা। দুই মিনিট পেরিয়ে গেল। কিছুই ঘটলো না। মাহি ইশারায় কিছু বলতে চেষ্টা রকলো অয়নকে। অনেকটা ‘কি বুঝলে’ টাইপের ইশারা। অয়ন মুখে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে বললো। লাভলুর লাইট জ্বালানোর ধরনটা অয়ন বুঝতে পেরেছে। নিশ্চয়ই কাউকে সঙ্কেত দেয়া হয়েছে। কিন্তু কাকে? এমন কেউ কি আছে ঘাটে, কিংবা সমুদ্রে! আরও আধা মিনিট পেরিয়ে যাওয়ার পর জবাব পাওয়া গেল। সমুদ্রে একটি ইঞ্জিন চালু হওয়ার শব্দ পেল ওরা। ধীরে ধীরে কাছে আসতে লাগলো শব্দটা। অন্ধকার ফুঁড়ে একটা কাঠামো স্পষ্ট হলো সমুদ্রের বুকে। ধীরে ধীরে ঘাটের দিকে আসছে ঘাটের দিকে। ঘাটের কাছাকাছি এসে লাইট জ্বলে উঠলো অচেনা কাঠামোটার ভেতরে। এবার চিনতে পারলো। বড় আকারের একটি স্পিডবোট। উপরে ট্রলারের মত ছাউনি, চারপাশ আটকানো। সামনের দরজার জায়গাটাও বন্ধ। ভেতরের লাইটের আলো ছিটকে বাইরে আসছে।
ধীরে ধীরে ঘাটে ভিড়লো বোট। ট্রলারটির পাশ ঘেঁষে জায়গা নিলো। খুলে গেল সামনের দরজা। সাথে সাথে লাভলু উঠে গেল বোটে। এরপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল। এখন কি করা উচিত তাই ভাবছে অয়ন। এ সময় মাহি বললো-
‘মনে হচ্ছে বোটের ভেতরে আরো লোকজন আছে।’
‘তা তো আছেই, আমার মনে হচ্ছে বড় কেউ হবে। নইলে এতবড় বোটে সাধারণ লোকজন চলে না। আবার সাধারণ কেউ হলে তো লাভলুদের বাড়িতে গিয়েই কথা বলতো। সেদিন যেমন দুটো লোককে দেখেছিলাম বাড়িতে।’ ফাহাদ বললো মাহির কথার সুরে।
‘তোমরা এখানে দাঁড়াও, আমি দেখছি।’ ওদের প্রসঙ্গে না গিয়ে অয়ন আদেশের সুরে বললো কথাটা।
‘কোথায় যাবে অয়ন ভাইয়া।’ প্রশ্ন করলো মাহি।
‘বোটটার কাছাকাছি গিয়ে অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করবো। তোমরা এখানেই দাঁড়াও।’
‘তুমি একা যাবে কেন? একসাথে যাই। একা গেলে কোন বিপদ হতে পারে। ওরা তো আর ভালো লোক নয়।’ ফাহাদ বললো।
অয়ন বললো- ‘একসাথে সবাই বিপদে পড়লে বাঁচাবে কে? তোমরা যদি দেখ আমি বিপদে পড়েছি তাহলে বাঁচাতে চেষ্টা করবে। সেটা সম্ভব না হলে বাংলোতে ফিরে গিয়ে আব্বুকে জানাবে।’
‘কিন্তু ভাইয়া…’ মাহি মিনমিন স্বরে কিছু বলতে চেষ্টা করলো। ওকে থামিয়ে দিল অয়ন।
‘কোন কিন্তু নয়, যা বলছি তাই করো।’ বিসমিল্লাহ বলে সামনে পা বাড়ালো অয়ন। সোজা না গিয়ে কিছুটা ঘুরে ডানদিক দিয়ে ঘাটের জেটিতে উঠলো। চুপচাপ কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো। চারপাশটা দেখে নিলো আরো একবার ভালো করে। সিদ্ধান্ত নিলো বোটের পাশের ট্রলারটায় উঠবে। দুটো একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে, তাই একটা থেকে আরেকটার সব কিছু না বোঝার কথা নয়। আস্তে পা ফেলে ট্রলারে উঠলো অয়ন। ভেতরটায় একবার উঁকি দিয়ে ছাদে উঠে এলো চুপিসারে। ছাদে হাঁটার ঝুঁকি নিলো না। ক্রলিং করে এগোতে লাগলো। বোটের ভেতর থেকে অস্পষ্ট কথাবার্তা ভেসে আসছে। তবে কি বলছে তা বোঝার উপায় নেই। ধীরে ধীরে নিজের শায়িত শরীরটাকে বোটের পাশে নিয়ে এলো অয়ন। কান পাতলো বোটের গায়ে। ভেতরের কথা এবার অনেকটাই স্পষ্ট। কথা শুনে বুঝলো তিনজন লোক আছে ওখানে। লাভলুর কণ্ঠ চিনতে সমস্যা হলো না। তবে অন্য দুটোর একটি কণ্ঠ বেশি কথা বলছে। বেশ মোটা কণ্ঠ, কথার ভঙ্গিও আদেশসুলভ। অয়ন কান পেতে শুনতে লাগলো কথা-
‘ঠিক আছে লাভলু, তোমরা যা করেছো খারাপ না। কিন্তু কথা হচ্ছে দুই মাসের বেশি হয়ে গেল এখনও কাজ শেষ করতে পারলে না। আরো লোক লাগলে বলো। ওদিকে গবেষক রিপোর্ট ফাইনাল করেছে। পার্টি কাজ শুরু করতে চায় দ্রুত। তাদের তো প্রস্তুতি নিতেও সময় লাগবে।’ মোটা কণ্ঠটা বললো।
‘জি বস বুঝতে পারছি, আমাদের কাজও প্রায় শেষ, কালকের অপারেশনটা সাকসেস হলে দেখবেন সব পালাতে শুরু করেছে।’ লাভলু কৈফিয়তের সুরে বললো।
‘কালকের কাজটা ভালোভাবে করা চাই লাভলু।’ এবার তৃতীয় আরেকটি কণ্ঠ কথা বললো, কণ্ঠটা চিকন। ‘পর্যাপ্ত লোক দেয়া হবে। তিনটে হোটেলেই অপারেশন চালাতে হবে। টুরিস্ট এবং কর্মচারী সবার মনে ভয় ধরিয়ে দিতে হবে।’
‘দরকার হলে দু-একটা লাশ ফেলে দিও।’ মোটা কণ্ঠটা বললো।
৮.
কথাগুলো শোনার সাথে সাথে মস্তিষ্কে নোট করে নিতে লাগলো অয়ন। একমনে শুনছে ও। তাই খেয়াল করেনি বোটের পেছন দিক থেকে একটি ছায়মূর্তি ওর দিকে এগিয়ে আসছে। যখন খেয়াল করলো তখন আর কিছুই করার নেই। লোকটার কথা কথা শেষ হতেই ঠক্ করে এটা শব্দ শুনে নিজের ডান দিকে তাকালো অয়ন। ঘাড় ফেরাতেই দেখলো একটা মানবমূর্তি লাফ দিয়ে বোটের ছাদ থেকে ট্রলারের ছাদে পড়লো। ওর শরীর থেকে এক ফুটের বেশি দূরে নয়। অয়ন কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর দুই বাহু চেপে ধরলো লোকটা। হাতে প্রচন্ড জোর লোকটার। অয়ন বুঝলো এর সাথে জোরাজুরি করে লাভ নেই, তাতে বরং বাহু দুটো ভেঙে যেতে পারে। অয়নকে ধরেই চিল্লাতে শুরু করলো সে- স্যার, চোর ধরছি, স্যার চোর। বোটের সামনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সবাই। লাভলু তার হাতের টর্চ লাইটের আলো ফেললো অয়নের মুখে। সাথে সাথে বললো- ‘স্যার এই চ্যাংড়াটা কয়দিন ধরেই আমাদের ডিস্টার্ব করছে। এখানে কি করছিস তুই হারামজাদা।’
অয়ন কিছু বললো না। যে ওকে ধরেছে সে বললো- ‘লুকিয়ে কান পেতে আপনাদের কথা শুনছিল। আমি বোটের পেছনে শুয়ে আছিলাম। ব্যাটা এত মন দিয়ে আপনাদের কথা শুনছে যে আমি ধরতে আসছি তাও দেখে নাই।’
‘ভেতরে নিয়ে আয় ওকে।’ সেই মোটা কণ্ঠটা বললো এবার। বলেই সবার আগে ভেতরে ঢুকলো সে। লাভলু আর সেই লোকটা মিলে অয়নকে নিয়ে গেল বোটের ভেতরে। বোটের দুই পাশে ফোমের কুশন দেয়া বেঞ্চি। সামনের ডান দিকে ড্রাইভিং হুইল। অনেকটা ছুড়ে দেয়ার মত করে অয়নকে বেঞ্চিতে বসিয়ে দিল ওরা। সব মুখ একবার দেখে নিল অয়ন। ওকে যে ধরেছে সেই লোকটা পুরনো একটা প্যান্ট আর টি-শার্ট পরা। পায়ে দুই ফিতার স্যান্ডেল। বোটের ড্রাইভার হতে পারে। তবে লোকটার দশাশই শরীর দেখে মনে হলো আর যাই হোক গায়ে দানবের শক্তি আছে। বাহু দুটো এখনও ব্যথা করছে। সামনের বেঞ্চিতে বসা দুজনের বয়স পঞ্চাশের কোটায়। গায়ে টি শার্ট-জিন্স আর পায়ে কেডস দু’জনেরই। মোটা লোকটা কথা বললো প্রথমে। মোটা কণ্ঠ শুনে অয়ন বুঝলো এতক্ষণ কর্তৃত্বের সুরে সেই কথা বলেছে। তার মানে এদের মধ্যে নেতা সে। ‘এই কে তুই, এখানে কি করছিস?’
লাভলু বললো স্যার এইটা ঐ টুরিস্ট স্পটের কন্ট্রাক্টরের ছেলে। ভীষণ বিচ্ছু। ওর সাথে আরও দুইটা আছে। ক’দিন ধরেই ওরা আমাদের পেছনে লেগেছে।’
‘তাই নাকি! তা তোর সাথের দুটো কই? আামদের পেছনে লেগেছিস এবার বুঝবি বাছাধন। এই আবু দেখতো আশপাশে ওর সঙ্গীদের পাওয়া যায় কি না! একসাথে খাতির যতœ করি সবাইকে। যা ধরে নিয়ে যায়।’
ভয় পেয়ে গেল অয়ন। ওরা ধরা পড়লে সেটা আরও খারাপ হবে। সাহায্য করারও কেউ থাকবে না। বললো- ওরা এখানে আসেনি, আমি একাই এসেছি।’
নেতা লোকটা আবার বললো- ‘তোমার কথায় আর বিশ্বাস নেই বাছা, আবু তুই যা খুঁজে দেখ। লাভলু তুমিও বের হও আবুর সাথে। আর শোন, যা বলেছি ঠিকঠাক মত করবে।’
‘এটাকে কী করবেন বস?’ অয়নকে দেখিয়ে লাভলু জানতে চাইলো।
‘ও আমাদের কাছেই থাকবে। ওর বাপকে কাবু করতে এইটা একটা দামি অস্ত্র। আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এটা আমাদের কাছে থাকবে। আর ওর বাপ যদি কথা না শোনে তাহলে ওকে টুকরো টুকরো করে ওর বাপের কাছে উপহার হিসেবে পাঠাবো।’ একটু চিন্তা করে আবার বললো-‘শোন তুমি, আজ রাতেই ওর বাপকে একটি চিঠি দেবে। বলবে আগামী আটচল্লিশ ঘন্টার মধ্যে তার দলবল নিয়ে দ্বীপ না ছাড়লে তার ছেলের লাশ পাবে। দেখি ব্যাটা কই যায়!’
চিকন লোকটা বললো- ‘দাঁড়াও তোমরা বাইরে যাওয়ার আগে ছোকড়াটাকে বেঁধে রেখে যাও। এইসব বিচ্ছুদের বিশ্বাস নেই। এদেরকে ধরে রাখতে গেলে হাতে কামড় দিয়ে পালাতে পারে। এরকম দামি একট জিনিস স্বেচ্ছায় যখন হাতে এসে ধরা দিয়েছে তাকে তো আর হাত ছাড়া করা যাবে না।’ কণ্ঠের মত শরীরটাও চিকন তার।
‘বেচারা, এই তোকে কে বলেছে এখানে মরতে আসতে, তুই জানিস তুই কোথায় এসেছিস? সাপের লেজে পা দেয়ার শখ হয়েছে। এবার বুঝবে মজা। আমাদের পেছনে লাগতে এসেছো।’ বলে অয়নের গাল ধরে টেনে দিল। ভঙ্গিটা আদর করা হলেও প্রচন্ড জোর ছিল হাতে। ব্যথায় উঁহ শব্দ করে উঠলো অয়ন। ওকে ব্যথা পেতে দেখে যেন মজা পেল ওরা। এক সাথে হেসে উঠলো আবু, লাভলু আর চিকন লোকটা।
আবু বোটের পেছনের একটা বাক্সের ভেতর থেকে মোটা নাইলনের দড়ি বের করলো। লম্বাভাবে শুইয়ে দিয়ে সিটের সাথে বেঁধে ফেললো অয়নকে। হাত আলাদা করে বাঁধলো, শরীর পেঁচিয়ে বাঁধলো বেঞ্চির সাথে। নড়তে গিয়ে অয়ন টের পেল কি শক্ত করে বাঁধা হয়েছে ওকে। এদিক ওদিক নড়লেই নাইলনের দড়ি বসে যাচ্ছে চামড়ায়। বেশি নড়াচড়া করলে চামড়া ছিলে যেতে সময় লাগবে না। তাই চুপচাপ থেকে চিন্তা করতে লাগলো। অযথা মাথা গরম করে কিছু হবে না। আগে এদেরকে ভালোভাবে বুঝতে হবে। পালানোর সুযোগ আসবেই, তবে প্রস্তুত থাকতে হবে সেই সুযোগের জন্য। এরা যা বলছে তা করতেও পারে। কারণ দ্বীপে দু’দুটো খুন, ডাকাতি-ছিনতাই সবই এরা করেছে বোঝা-ই যাচ্ছে। আগামীকাল আবার আবাসিক হোটেলগুলোয় ডাকাতির পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রয়োজনে খুনও করতে বলা হয়েছে। দ্বীপের দখল নেয়াই এদের উদ্দেশ্য সেটা পরিষ্কার বোঝা যায়, কিন্তু কারা এরা? দ্বীপ দখল করেই বা কি করবে। এমন নয় যে ঘরবাড়ি তৈরি করে থাকতে শুরু করার জন্য অন্যদের তাড়াতে চাইছে। নিশ্চয়ই অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে। লাভলু আর গবেষকা দ্বীপে এদের প্রতিনিধি হয়ে সব কাজ করে। প্রয়োজনে বাইরে থেকে আরও লোক আনা হয়। ওরা বলেছে গবেষক তার রিপোর্ট ফাইনাল করেছে, পার্টি দ্রুত কাজ শুরু করতে চায়। কিসের রিপোর্ট, কারা সেই পার্টি, কি কাজ শুরু করবে? সব কিছু মিলিয়ে উঠতে পারলো না অয়ন। তাই আপাতত দেখে যাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই। আগে এদের হাত থেকে পালানোর চেষ্টা করতে হবে।
‘তোমরা যাও এবার, বাইরে দেখ ও দুটোকে পাও কি না? বেচারার একা থাকতে ভাল-াগছে না বোধ হয়।’ লাভলু আর আবুকে বললো নেতা লোকটা। বলেই হো হো করে হেসে উঠলো।
ঝোপের আড়ালে বসে ঘটনাটা টের পেল ফাহাদ আর মাহি। পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও অয়ন যে ধরা পড়েছে সেটা বুঝলো। কিছুটা ভয় পেলেও সাহস হারালো না। সিদ্ধান্ত নিলো অয়নকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। এ সময় বোটের দরজা খুলে দুটো লোক বেরিয়ে আসতে দেখলো। তারা টর্চলাইট জ্বেলে আশপাশে খুঁজতে লাগলো কিছু একটা। লোক দুটো যে ওদের দু’জনকেই খুঁজছে বুঝতে সময় লাগলো না। কারণ অয়নের সাথে তার সঙ্গীরা থাকবে এটা ওদের জানার কথা। কণ্ঠ শুনে লাভলুকে চিনতে পারলো। এই মুহূর্তে ধরা পড়া চলবে না। বরং অয়নকে বাঁচানোর চিন্তা করতে হবে। অয়নের বুদ্ধিটাই কাজে লাগাবে চিন্তা করলো। বাংলোয় গিয়ে অয়নের আব্বুকে সব খুলে বলবে। এরা ভয়ঙ্কর লোক, যা কিছু করতে পারে। আর সময় নষ্ট করা যাবে না। সিদ্ধান্ত নিয়ে গাছের আড়াল রেখে পিছু হটতে শুরু করলো ফাহাদ আর মাহি। দ্রুত পৌঁছে গেল বাংলোয়।
সে রাতেই অয়নের আব্বুর রুমের সামনে একটি চিঠি পাওয়া গেল রত্নদ্বীপ ছাড়ার হুমকি দিয়ে। অন্যথায় তার ছেলের লাশের জন্য অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। রাতেই তাকে ঘটনা খুলে বলেছে ফাহাদ আর মাহি। শুরু থেকে যা যা ঘটেছে, ওরা দ্বীপে আসার পর যা দেখেছে সব। টুরিস্ট স্পটের কাজ বন্ধ করার জন্যই যে এতকিছু হচ্ছে সেটা বললো ওরা। সব শুনে কিছু বলেননি অয়নের আব্বু। ওদেরকে ঘুমাতে যেতে বলে নিজের ঘরে যান তিনি।
৯.
ধীর ধীরে চোখ খুললো অয়ন। নড়তে গিয়ে টের পেল ও বাংলোয় নেই। সারা শরীর বাঁধা। আস্তে আস্তে সব মনে পড়লো রাতের কথা। এখন ক’টা বাজে বুঝতে পারলো না। তবে বাইরের আলো দেখে বোঝা যায় রাত পেরিয়ে আরেকটি দিন হয়েছে অনেক আগেই। ঘাড় ঘুরিয়ে বোটের চার পাশটা দেখলো অয়ন। কেউ নেই, থাকার কথাও নয়। অয়নকে রাতে ট্রলার ঘাটে অনেকক্ষণ জেরা করার পর ওরা বোট চালু করে মাঝ সমুদ্রে আসে। ফাহাদ আর মাহি ধরা পড়েনি। কতক্ষণ পর আবু বোটে ফিরে এসেছে আর লাভলু বাড়ি চলে গেছে। এরপর নিজেদের মাঝে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ওরা। অয়ন চুপ করে থাকতে থাকতে একটা বুদ্ধি আঁটে মাথায়। ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকে। নড়াচড়া নেই দেখে একজন ধাক্কা দেয় অয়নের গায়ে। কিন্তু তাতেও শব্দ নেই দেখে ভাবে ঘুমিয়ে গেছে। নেতা লোকটি কণ্ঠে নকল আফসোসের ভান করে বলে- ‘আহারে! বাচ্চা ছেলে সন্ধ্যে থেকে কিছু খায়নি, তার ওপর এত খাটুনি গেল। বোধ হয় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।’
অয়নকে কি করবে সেটা নিয়ে ওদের মাঝে কথা হয় অনেকক্ষণ। একবার ওদের সাথে নিয়ে যেতে চাইলো। আবার বললো তাতে ধরা পড়তে পারে। কথা শুনে বুঝেছে ওরা কুয়াকাটায় থাকে। একটা হোটেলে উঠেছে। হোটেলের নামটাও মনে আছ অয়নের। মোটা লোকটা বাইরে থেকে এলেও চিকনটি এলাকার লোক। মোটুর সাগরেদ হিসেবে কাজ করে। ধরা পড়ার আশঙ্কায় হোটেলে নেয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল হলো। দ্বীপে গবেষক আর লাভলুর বাড়িতে রাখার কথাও হলো কিন্তু সেটা বাতিল হলো ওর আব্বু পুলিশ নিয়ে হানা দিতে পারে এই আশঙ্কায়। বললো- এমন জায়গায় রাখতে হবে যাতে কেউ খুঁজেও না পায়।
বোট ড্রাইভার আবু বললো- ‘স্যার এইডারে বোটে বাইন্ধ্যা রাখেন, তাইলে কেউ আর টের পাইবো না।’
আবুর প্রস্তাব মনে ধরলো নেতা লোকটির। তার নাম আজগর। রাতের কথায় অন্তত তাই বুঝেছে অয়ন। চিকনা একবার তাকে আজগর ভাই বলে সম্মোধন করছে। তবে চিকনার নাম বলতে শোনেনি কারও মুখে।
আবুর প্রস্তাবটা কেমন হয় চিকনার কাছে জানতে চায় আজগর। কতক্ষণ চিন্তা করে সায় দিলো চিকনা। তবে বললো কুয়াকাটা ঘাটে অনেক বোট আর লোকজন থাকে। এই বাচ্চা চিল-াচিলি- করলে লোকজন টের পেয়ে যাবে।
তারপর সিদ্ধান্ত নিল ওকে বোটেই বেঁধে রাখবে, তবে বোট কুয়াকাটা নেবে না। ডেরায় রাখবে বললো। আরেকটা বোট নিয়ে ওরা কুয়াকাটা ফিরবে। ডেরা কি বুঝতে পারলো না অয়ন। তবে কথাবার্তায় বুঝলো দ্বীপের আশপাশেই হবে জায়গাটা। আবুকে ডেরার দিকে বোট ঘুরাতে বললো আজগর। বোটের দিক পরিবর্তন টের পেল অয়ন। প্রায় আধাঘন্টা চলার পর বোটের গতি কমলো। সমুদ্র ছেড়ে অন্য কোথাও প্রবেশে করেছে বোট। একসময় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল। পুরোপুরি থেমে গেল বোট। সবার আগে বোট ছেড়ে নামলো আবু। কতক্ষণ পর আরেকটি বোট এসে ভিড়লো এই বোটের গায়ে। নেমে গেল আজগর আর চিকনা। দু’জনেই অয়নের মুখের ওপর উঁকি দিয়ে দেখলো ঘুমিয়েছে কি না। আজগর বললো- ‘থাকো বাছা, ঘুমাও তুমি আমরা চললাম। কাল সন্ধ্যার অপারেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমাকে এখানেই কষ্ট করে থাকতে হবে।’ এরপর চিকনাকে উদ্দেশ করে বললো কাল সন্ধ্যায় লোকজন যারা আসবে তাদের কাছে ওর জন্য কিছু খাবার পাঠিয়ে দিতে।
হাত নাড়াতে চেষ্টা করলো অয়ন; কিন্তু পারলো না। নাইলনের দড়ি বসে যাচ্ছে চামড়ায়। চারদিক তাকিয়ে উপায় খুঁজলো। যে কোন ভাবে এখান থেকে মুক্ত হতে হবে। নইলে আজ আবার খুন খারাবি ঘটবে দ্বীপে। ওর আব্বুকেও কাজ গুটিয়ে দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করবে ওরা। দ্বীপটা দখল করতে ওরা যে কোন কিছু করতে পারে। তবে এ সবই ঠেকানো সম্ভব অয়ন এখান থেকে পালাতে পারলে। কথা শুনে বুঝেছে সন্ধ্যার আগে এই বোটে কেউ আর আসবে না ওরা। তার মানে অয়ন পালালেও ওরা সেটা টের পাবে সন্ধ্যায় যখন দলবল নিয়ে ডাকাতি করতে আসবে। আর এর আগেই যদি পুলিশকে জানানো যায় তাহলে ওদেরকে হাতেনাতেই ধরা সম্ভব।
একটু মোড়ামুড়ি করতেই যে টুলটায় ওকে শোয়ানো হয়েছে সেটা নড়ে উঠলো। অয়নের সন্দেহ হলো টুলটা পাটাতনের সাথে জোড়ানো নেই। আরও জোরে শরীরটাকে ডানে বামে নাড়িয়ে দিল ও। এবার কাজ হলো বাম দিকে বোটের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে পুরো টুলসহ বোটের মেঝেতে কাত হয়ে পড়লো অয়ন। ডান কাঁধে চোট পেল তবে গায়ে মাখলো না সেটা। আশপাশে তাকালো কোন কিছু সহযোগিতা পাওয়া যায় এই আশায়। পেল না তেমন কিছু। পায়ের দিকে তাকালো। সামান্য একটু পরিবর্তন দেখতে পেল। বেঞ্চিতে মোট দুইটা কুশন পাশাপাশি রাখা। মাথার দিকে একটা আর কোমড় থেকে নিচের দিকে একটা। মেঝেতে ধাক্কা খেয়ে পায়ের অংশের কুশনটা টুল ছেড়ে অনেকখানি বেরিয়ে গেছে। আশার আলো দেখতে পেল অয়ন। কুশনটা পুরোপুরি বের হয়ে গেল পায়ের বাঁধন ঢিলে হয়ে যাবে। পা দিয়ে আস্তে আস্তে বাইরের দিকে ঠেলতে লাগলো কুশনটাকে। প্রতিবারে দু’এক সেন্টিমিটার করে সড়ছে সেটা। দশ মিনিট এভাবে করার পর প্রায় অর্ধেকটা সরে গেছে; কিন্তু ততক্ষণে পায়ের শক্তি কমে এসছে। কয়েক মিনিট জিরিয়ে নিয়ে আবার শুরু করলো একই কাজ। এবার আগের চেয়ে দ্রুত সরতে লাগলো কুশনটা। কয়েকবারের চেষ্টায় পুরোটা বেরিয়ে গেল টুল ছেড়ে। শক্ত বাঁধনের মাঝ থেকে প্রায় দুই ইঞ্চি মোটা কুশনটা সরে যাওয়ায় পায়ের বাঁধন আলগা হয়ে গেল। একটু চেষ্টা করতেই দড়ি থেকে পা বের করে ফেলতে পারলো অয়ন।
পা দুটো যেন জমে গেছে। স্বাভাবিক হতে সময় লাগলো বেশ কিছুক্ষণ। শরীর ঘেমে গেছে এরই মধ্যে। তবে বসে থাকার সুযোগ নেই। এবার হাতের বাঁধন খেলায় মনোযোগ দিলো। পা ভাঁজ করে উঠে বসতে চেষ্টা করলো। টুলটা পিঠে নিয়ে কোন মতে বসতে পারলো। হাত দুটো পেটের কাছে বাঁধা ছিল। মাথা নিচু করে মুখটা সেখানে নিতে চেষ্টা করলো, শোয়া অবস্থায় যেটা সম্ভব ছিল না। কিন্তু মুখটা পুরোপুরি হাতের কাছে গেল না। হাত দুটোকে টেনে কিছুটা উপরে উঠাতে পারলে কাজটা সহজ হবে। তাই করলো। দড়িতে টান লেগে চামড়া ছিঁড়ে গেল কিন্তু কেয়ার করলো না। মুখ আর হাত এক জায়গায় হতেই দাত দিয়ে দড়ির গিঁট খুলতে শুরু করলো। টান লেগে গিঁট আরও শক্ত হয়ে গেছে তাই সহজে খুলছে না। তবে এক সময় অয়নের পরিশ্রমের কাছে হারতে হলো সেটাকে। দ্রুত নিজেকে মুক্ত করলো। কিন্তু ততক্ষণে শরীরের শক্তি সব শেষ হয়ে গেছে। উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই। এমনিতেই কাল সন্ধ্যা থেকে কিছু পেটে পড়েনি। তার ওপর এত পরিশ্রম। কোনরকম শরীরটাকে টেনে নিয়ে পাশের বেঞ্চিটায় শুয়ে পড়লো। পাঁচ মিনিট চোখ বন্ধ করে পড়ে থাকলো। তারপর ধীরে ধীরে কিছুটা শক্তি ফিরে এলো শরীরে। চারদিকে তাকিয়ে বের হওয়ার পথ খুঁজলো। সামনের দরজায় ওরা রাতেই তালা লাগিয়ে গেছে। বিকল্প পথে বের হতে হবে।
যাওয়ার আগে বোটটি সার্চ করার চিন্তা মাথায় এলো। কাজে লাগবে এমন কোন কিছু পাওয়া যেতে পারে। পেছনের দিকে এক কোণে দুটো কাগজের স্টেশনারি বক্স দেখলো অয়ন। বেশি কিছু পাওয়া গেল না বক্স দুটোতে। একটাতে একটা খাম পাওয়া গেল আজগর আলীর নাম ঠিকানা লেখা। ভবিষ্যতে কাজে লাগবে ভেবে অয়ন সেটা নিয়ে নিলো। এবার বের হওয়ার জায়গা খুঁজতে লাগলো। বেড়ার গায়ে একটা জানালার সিটকানি ধরে টান দিতেই খুলে গেল। উঁকি দিয়ে বাইরে তাকালো। প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিলো খোলা বাতাসে। বের হওয়ার আগে পায়ের কেডসের মধ্যে হাত দিয়ে ছোট ফোল্ডিং ছুরিটা পেল জায়গা মতো। অয়ন ছোট বলে হয়তো ওরা শরীর সার্চ করেনি। টর্চ লাইটা রয়ে গেছে ফাহাদের কাছে। তখনই মনে পড়লো ওদের কথা। ধরা যেহেতু পড়েনি এতক্ষণে নিশ্চয়ই বাবাকে সব জানিয়েছে। আর সব জানলে বাবা বসে থাকার পাত্র না। ছুরিটা হাতেই রাখলো অয়ন। জায়গাটা কোথায় এখনও জানে না। আগেই প্রস্তুত থাকা ভালো। একবার যেহেতু বের হতে পারছে তাহলে আর ধরা পড়া যাবে না।
বোটের জানালা দিয়ে মাথাসহ শরীরের অর্ধেকটা বের করে দিল অয়ন। ঐ অবস্থায়ই শরীরটাকে ঘুরিয়ে চিত হয়ে গেল এরপর হাত বাড়িয়ে বোটের ছাদের কিনার ধরলো। এবার বের করে আনলো পুরো শরীর। এক ঝটকায় উঠে এলো ছাদে। চারদিক তাকলো, না আশপাশে কেউ নেই। জায়গাটা চিনতে চেষ্টা করলো। চারপাশে গোলপাতার গাছ। তার মাঝে একটা খালের মতো জায়গা। জায়গাটায় নিয়মিত লোকজন যাতায়াতের ছাপ রয়েছে। মাটিতে বোট ভেড়ানোর চিহ্ন আছে অনেক জায়গায়। জলাশয়টা একেবেকে পূর্বদিকে চলে গেছে। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ শুনলো অয়ন। সমুদ্র থেকেই হয়তো এই জায়গাটায় এসেছে বোট। এটা যদি ওদের ডেরা হয় তাহলে বলতে হবে এই জায়গাটা নিয়মিতই ব্যবহার করে দুষ্কৃতকারীরা। সেদিন ড্রাইভারকে তোলার জন্য লাভলু এরকম একটি গোলপাতার বন থেকেই বোট নিয়ে বেরিয়েছিল। হতে পারে এটাই সেই জায়গা। আর কিছু না ভেবে এবার যাওয়ার চিন্তা করলো অয়ন। নেমে এলো বোট থেকে। জলাশয় থেকে একটা পায়ে হাঁটা পথ চলে গেছে গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে। পথটা দিয়ে নিয়মিত লোক চলাচল হয় বোঝাই যাচ্ছে। সে পথটা ধরেই এগোলো অয়ন। কতদূর হাঁটার পর পথ ছেড়ে ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। কারও সামনে পড়তে চায় না। কতদূর এসে একটা রাস্তায় উঠেছে পথটা। এবার জায়গাটা চিনতে পারলো অয়ন। ওদের বাংলোর সামনে দিয়ে দ্বীপের উত্তর দিকে যে রাস্তাটা চলে গেছে এটা সেই রাস্তা। তার মানে লাভলুদের ডেরাটা দ্বীপের উত্তর মাথায়। এবার হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিল অয়ন।
১০.
অয়ন যখন নিজেদের বাংলোয় ঢুকলো ঘড়িতে তখন দুপুর প্রায় ১২টা। ছেলেকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হলো ওর বাবা। সেই সকাল থেকে মনমরা হয়ে বাংলোয় বসেছিলেন তিনি। কী করবেন তাই নিয়ে ভেবে কাটিয়েছেন কাল রাত থেকে। চেহারা দেখে অয়ন বুঝলো সারারাত চোখের পাতা এক করতে পারেনি বাবা। ফাহাদ, মাহি, এমনকি সালামের চেহারও বিধ্বস্ত। ওর কথা চিন্তা করে সবার মনের ওপর দিয়ে কি রকম ঝড় বয়ে গেছে সেটা বুঝতে সময় লাগলো না। সময় নষ্ট না করে দ্রুত সব খুলে বললো বাবাকে। নিজের বুদ্ধিমত পরামর্শও দিলো সাথে।
সেই সময় থেকে ফাহদ আর মাহিকে পাঠানো হলো গবেষকের বাড়ির ওপর নজর রাখতে। ওরা কেউ বাড়ি থেকে বের হয় কি না, বের হয়ে কোথায় যায় তা দেখতে হবে। সেই সাথে ওদের এমন ভাবে নজরদারি করতে বললো যাতে তারা ওদের দেখতে পায়। চোখে ধুলো দেয়ার জন্যই এই ব্যবস্থা। নজরদারি করতে দেখলো ওরা বুঝতে পারবে না অয়ন ফিরে এসেছে। ভাববে অয়নের খোঁজ পাওয়ার জন্যই ওর বন্ধুরা ঐ বাড়ির ওপর চোখ রাখছে। একই সময় সালাম মিয়া বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে। তাকে বলা হলো স্পিডবোট নিয়ে দ্বীপের পশ্চিম দিকে যেতে। অয়নের আব্বু সেখান থেকে বোটে উঠবেন। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে কুয়াটাকা যাবেন তিনি। এই থানার ওসি তার পরিচিত। এখানে কাজ শুরু করার পর থেকেই পরিচয়। তাকে নিয়ে সন্ধ্যায় সন্ত্রাসীদের ধরার ব্যবস্থা করবেন। অয়ন ঘরেই শুয়ে বসে কাটালো একা।
সন্ধ্যায় সব কিছুই পরিকল্পনামত হলো। লাভলুদের ডেরায় ত্রিশজন পুলিশের একটি দল ওঁৎ পেতে ছিল বিকেল থেকে। লাভলু সেখানে গিয়েছিল ডাকাতদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসতে। দু’টি বোটে ডাকাতরা আশামাত্র তাদের গ্রেফতার করা হলো। দু’জন অবশ্য পালাতে পেরেছে। বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হলো গবেষক ড. শাহেদকে। বেশ কিছু যন্ত্রপাতিও জব্দ করলো পুলিশ সেখান থেকে। আর কুয়াকাটার আবাসিক হোটেল থেকে আটক হলো আজগর আর তার সহযোগী সেই চিকনা। ওসির অনুরোধে পরদিন সকালে থানায় গেল অয়নের আব্বুর সাথে ওরা সবাই। ওসির কাছে শুনলো সব ঘটনা। ড. শাহেদ একজন ভূতাত্তিক গবেষক। বিদেশে থাকতেন তিনি। মাস তিনেক আগে রত্নদ্বীপে কাজ করার জন্যই তাকে দেশে নিয়ে আসে আজগরের কোম্পানি। দ্বীপের আশপাশে প্রচুর খনিজসম্পদ আছে বলে তারা জানতে পারে। তাই গবেষকের কাজ ছিল খনি চিহ্নিত করা আর লাভলুর কাজ ছিল নানান ঘটনা ঘটিয়ে দ্বীপের বাসিন্দা ও টুরিস্টদের ভয় দেখিয়ে দ্বীপ থেকে তাড়ানো। কারণ দ্বীপটাতে যেভাবে দিনদিন টুরিস্টদের ভিড় বেড়ে চলেছে তাতে তারা গোপনে খনি থেকে সম্পদ চুরি করতে পারবে না। ওসি জানালেন ঢাকায় রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে। কাল রাতেই আজগরের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে খনি অনুসন্ধানবিষয়ক বেশ কিছু ডকুমেন্ট পেয়েছে পুলিশ। অফিসটি সিলগালা করে দেয়া হয়েছে।
ওসি সাহেবকে আবারও ধন্যবাদ দিলেন অয়নের আব্বু। একে একে সবাই হ্যান্ডশেক করে বেরিয়ে এলো থানা থেকে।
(সমাপ্ত)
সাইকেলের বেলটা নিয়ে বেশ সমস্যা হচ্ছে। হঠাৎ করেই নষ্ট হয়ে গেলো। সামনে একটা বিশাল জ্যাম। এই জ্যামের মধ্যে বেল ছাড়া কিভাবে রাস্তা পার হবো ভেবে পাচ্ছি না। তা ছাড়া বেল বাজিয়েই বা লাভ কী? এভাবে বেল বাজিয়ে লোকজনকে সরিয়ে দেয়া খুবই লজ্জাকর।
খুবই বিবেকহীন কাজ। কারো উপকার করার চিন্তা তো নেই-ই। এখন দেখছি নিজের সুবিধার জন্য অন্য লোকদেরকে তাচ্ছিল্য করা হবে। ইস্ কী অসহ্য! এ যে রীতিমতো অভ্রতা।
প্রতিদিন এভাবে সবাইকে বিরক্ত করার বদলে একদিন  সাইকেল চালানোই বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু এ নিয়ম বেশি দিন টিকিয়ে রাখতে পারিনি। কেননা, বাসা থেকে স্কুল অনেক দূরে। হেঁটে যেতে অনেক কষ্ট হয়। তা ছাড়া হেঁটে গেলে কোনো কোনো দিন ক্লাস ধরাই মুশকিল হয়ে পড়ে। তাই আমি নিজে সাইকেল চালাতে না চাইলেও সাইকেলই আমাকে বাধ্য করেছে একে চালাতে।
আজ একেবারেই সমস্যায় পড়ে গেলাম। হয়তো স্কুলে যাওয়াই মিস হয়ে যাবে। ঠিক তাই। স্কুলে আর যাওয়া হলো না। রাগে-দুঃখে শরীর কসমস করতে লাগলো। কিছু না বুঝে বাসায় চলে এলাম। শান্ত হওয়ার জন্য একটু ঘুমুতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুমতো এলোই না, বরং নানা টেনশন তীরের মতো এসে আমার মাথাকে অবশ করে দিতে চাইলো। কিছুতেই মাথা থেকে দূর করতে পারলাম না। মনে হতে লাগলো “ইস্ সাইকেল যদি না থাকতো, তাহলে কত্তো ভালো হতো! সবাই হেঁটে যেতো আর স্কুলও দেরিতে আরম্ভ হতো। চলার পথে কাউকে বিরক্ত হতে হতো না।…..” এ রকম নানা চিন্তা-ভাবনায়  কিছুতেই কিছু করতে পারলাম না। না পারলাম ভালো চিন্তা মাথায় আনতে, না পারলাম কোনো সমাধান বের করতে। তবুও এক নাগাড়ে সমাধানের চিন্তা করতে লাগলাম। ভাবলাম, এ ঝামেলা থেকে মুক্তির একটা অভিনব উপায় আবিষ্কার করতে হবে। যেই না আবিষ্কারের কথা মাথায় এলো ওমনি মনে হলো জামি সায়েন্টিসের কথা। পুরোনাম ড. জামিউল হক জামি। তার নেশা ও পেশা জ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করে প্রবন্ধ লেখা। সেই সাথে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির খন্ডকালীন লেকচারার হিসেবেও তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো তিনি একজন স্বভাববিজ্ঞানী। ছোটবেলা থেকে এটা-সেটা দিয়ে খেলনা তৈরি, বিজ্ঞানের নানা রকম প্রজেক্ট তৈরি ছাড়াও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাতামাতি করতেন। তাই টুকিটাকি প্রযুক্তিগত নতুন জিনিস উদ্ভাবন করা তার কাছে এক তুড়ির খেলা মাত্র।
এইতো সেদিন তিনি আমার একটা জটিল সমস্যার কতো সুন্দর আর সহজ সমাধানটাই না দিলেন। আমার প্রতিদিন মাথা ধরে বলে তার কাছে গিয়েছিলাম পরামর্শ নিতে। আহ! বেচারা এতো চমৎকার আর সহজ একটা বিষয় শিখিয়ে দিলেন, পরীক্ষা না করে দেখলে সত্যি অবিশ্বাস্য মনে হতো । তিনি বললেন-
“তোমার যখন মাথা ধরবে বা কোনো কারণে মন খারাপ থাকবে কিংবা কোনো কাজ ভালো লাগবে না, মন অস্থির অস্থির লাগবে, পড়ালেখায় মনোযোগ আসবে না বা পড়তে ইচ্ছে করবে না, তখন দেরি না করে তৎক্ষণাৎ ঘুমিয়ে পড়বে। দেখবে ঘুম থেকে ওঠার পর তোমার সব কিছু ভালো লাগছে।”
কী তাজ্জব ব্যাপার! যে কথা সেই কাজ। আমার একদিন প্রচন্ড মাথা ব্যথা হলো, ঘুমিয়ে পড়লাম। অন্য একদিন মন খারাপ হলেও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি সব ঠিক হয়ে গেছে। ঘুমের মাঝে মাথা ব্যথা আর অভিমান কোথায় যে পালিয়ে গেলো টেরই পেলাম না।
বিকেলেই রিকশাযোগে রওনা দিলাম জামি সায়েন্টিসের বাড়িতে। গিয়ে দেখি তিনি একটা মাছ নিয়ে গবেষণা করছেন। তাই প্রথমে আমাকে দেখে একটু ইতস্ততবোধ করলেন। পরে অবশ্য বললেন-
“তুমি এসেছো ভালোই হলো। গল্প করা যাবে। এখন একটু ড্রইং রুমে গিয়ে বোস। আমি আসছি।”
আমি ড্রইং রুমে খানিকক্ষণ বসে থাকার পর তিনি এলেন। মৃদু হেসে বললেন-
“তো কী খবর? কোনো সমস্যা-টমস্যা হয়েছে নাকি?”
আমি একটু কেশে নিয়ে বললাম-
“আর বলবেন না, আমার সাইকেলের বেলটা নিয়ে বেশ ঝামেলায় আছি।”
জামি আঙ্কেল আগ্রহের সুরে আমার চোখে চোখ রেখে বললেন-
“কেন কেন কী হয়েছে?”
আমি জোর গলায় বলতে লাগলাম-
“এই যে সাইকেল চালানোর সময় আমরা অযথা বেল বাজিয়ে আলাভোলা পথচারীদের পূর্বাভাস দিয়ে বোঝাচ্ছি- “তাড়াতাড়ি কেটে পড়েন, নইলে খবর আছে! এটা কি ঠিক হচ্ছে?”
“আচ্ছা! আচ্ছা!” জামি আঙ্কেল মজা পাচ্ছেন।
“ক্রিং-ক্রিং-ক্রিং- কী একটা অভদ্র শব্দ!”
জামি আঙ্কেল আমার কথা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর অনেকক্ষণ নীরব হয়ে কিছু একটা ভাবছিলেন। হঠাৎ যেন লাফিয়ে উঠলেন। আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললেন-
“পেয়েছি! পেয়েছি!”
“কী পেয়েছেন?”
“সমাধান!”
“কিসের?”
“তোমার বেলের।”
“আমার বেলের!”
“সরি-সরি তোমার নয়, তোমার সাইকেলের বেলের।”
“কী?”
“সাইকেল কথা বলবে!”
“মানে!”
“আহ! সহজ কাথাটাই বুঝতে পারছো না?”
“না, খুলে বলুন।”
“খোলা-খুলির কিছু নেই। অপেক্ষা করো একাই বুঝে যাবে।”
বলে তিনি বিষয়টা আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। আমি কিছু না বুঝেই বোঝার ভান করে বললাম-
“কিভাবে সম্ভব?”
“মোটেই অসম্ভব নয়। একটুখানি ধৈর্য ধরো আর দেখো কী করি।”
জামি আঙ্কেলের সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে বিকেল গড়িয়ে রাত হয়েছে টেরই পাইনি। তাই আরো কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছে থাকলেও থাকতে পারলাম না। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এলাম।
পরের দিন। ফজরের আজান দেয়ার সাথে সাথে ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। উঠে মুখ-হাত ধুয়ে, নামাজ-কালাম পড়ে তড়িঘড়ি কিছুটা খেয়ে নিলাম। ঘড়িতে সকাল সাতটা বাজতেই রওনা হলাম জামি আঙ্কেলের বাড়ির উদ্দেশে। গিয়ে তাকে পেলাম তার ল্যাবরেটরি ঘরে। দেখলাম তিনি গবেষণায় মগ্ন। আমি আস্তে করে একবার ডাকলাম-
“আঙ্কেল!”
তিনি শুনতে পেলেন না। এরপর একটু জোরে ডাকলাম। তাও তিনি শুনতে পেলেন না। এবার চেঁচিয়ে  উঠলাম-
আঙ্কেল চমকে গিয়ে বললেন-
“কে- কে- কে!”
আমি বললাম-
“আঙ্কেল আমি!”
“অঃ, তুমি! তা কখন এলে? ভয়’ই পেয়ে ছিলাম!”
“সরি আঙ্কেল! আমি অনেকক্ষণ ধরে আপনাকে ডাকছি। আপনি শুনছিলেন না তাই…”
“ঠিক আছে। যাও ড্রইং রুমে গিয়ে টিভি দেখ। আমার আসতে দেরি হবে।”
“আচ্ছা।”
বলে আমি ড্রইং রুমের দিকে পা বাড়িয়েছি। ওমনি তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন-
“শোনো, শোনো!”
“বলেন।”
“তোমার সাইকেলটা কি নিয়ে এসেছো?”
“না আঙ্কেল।”
“বলো কী? ওটাই তো এখন লাগবে! গতকাল রাত তিনটা পর্যন্ত তোমার সাইকেল সমস্যা সমাধানের একটা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছি।
কাথাটা শুনে উত্তেজনায় আমি আত্মহারা হয়ে বললাম-
“কী সেটা? বলা যাবে কি?”
“অবশ্যই যাবে, তবে তোমার সাইকেলটা যে লাগবে!”
“আচ্ছা, তাহলে সাইকেল আনতে আমি এখনই বাড়ি যাচ্ছি।”
“কতক্ষণ লাগবে?”
“এই যাবো, আর সাইকেলটা নিয়ে আসবো।”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ তাই যাও।”
আমি বাড়ি যাবার জন্য জামি আঙ্কেলের বাসা ছেড়ে রাস্তায় এসে রিকশার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু কোনো রিকশা পেলাম না। এদিকে আমার এক মুহূর্তও দেরি সহ্য হচ্ছিলো না। তাই সেখানে আর দাঁড়িয়ে না থেকে এক দৌড়ে বাড়ি চলে এলাম।
সাইকেলটা সাথে করে জোরে জোরে প্যাডেল করে আবার রাস্তায় এসে জামি সায়েন্টিসের বাড়ির দিকে রওনা দিলাম। এতো জোরে চালাচ্ছিলাম যে সম্মুখ থেকে ছুটে আসা একটা বাইকের সাথে ধাক্কা লেগে এক ঝটকায় পড়ে গেলাম পিচঢালা রাস্তায়। ফলে হাঁটু আর ডান হাতের কনুইয়ে চোট লেগে জ্বালা করতে লাগলো। সঙ্গে সঙ্গে খানিকটা রক্তও বের হলো।
কিন্তু এসব উপেক্ষা করে আমি সাইকেলটা রাস্তা থেকে তুলে পুনর্বার রওনা হলাম জামি সাহেবের বাড়ি অভিমুখে।
জামি আঙ্কেল আমার এ দশা দেখে রীতিমতো ভরকে গেলেন। বললেন-
“কাব! তোমার একি অবস্থা! কিভাবে হলো?”
আমি অ্যাকসিডেন্টের ঘটনা তাকে খুলে বললাম।
তিনি জিব দিয়ে চুক চুক শব্দ করে বললেন-
“ইস, কী ব্যথাটাই না পেয়েছো! দাঁড়াও ড্রেসিন করে ব্যান্ডেস বেঁধে দিচ্ছি।”
বলে তিনি ল্যাবরেটরি ঘর থেকে কিছু তুলো আর স্যাবলন এনে আমার ট্রিটমেন্ট করতে লাগলেন। তার এমন আনকোরা ট্রিটমেন্ট দেখে মনে হলো : তিনি পূর্বে ডাক্তারি করেছেন। ইচ্ছে হলো তাকে এ ব্যাপারটি নিয়ে জিজ্ঞেস করি। করেও  ফেললাম-
“আঙ্কেল!”
“বলো কাব।”
“আপনি  কি  ডাক্তার?”
“না-না! তবে গবেষণার প্রয়োজনে এক বছরের মেডিক্যাল প্রশিক্ষণ নিয়েছিলাম। তাই এই একটু-আধটু  আরকি-!”
আমি একগাল হেসে বললাম-
“ভালো-ভালো, খুব ভালো!”
আমার এমন প্রশংসাসূচক বাক্য শুনে তিনি আপত্তি তুলে বললেন-
“কী ভালো?”
আমি অনায়াসে বলে দিলাম-
“এইযে আপনি একাধারে একজন বিজ্ঞানী, সুলেখক। সেই সাথে একজন চিকিৎসকও। যাকে এক কথায় বলে সবজান্তা। বাহ, বাহ!”
তিনি জোর আপত্তি তুলে বললেন-
“না- কাব, এভাবে বলো না! আসলে সবজান্তা বলে কোনো কথা নেই। আমরা মানুষ। আমাদের জ্ঞান খুবই সীমিত। এইযে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড দেখছো; এর যিনি স্রষ্টা তিনিই কেবল সবজান্তা। তিনি আলিমুল গায়েব। আমাদের খালিক- মালিক। তিনিই আমাদের জ্ঞান দিয়েছেন। তবে আমরা খুব মূর্খ। আসল জ্ঞানী তো তিনিই। তাই এসো আমরা নিজেদের প্রশংসা না করে তাঁরই প্রশংসা করি। বলি-
“আলহামদুলিল্লাহ!”
আমিও  বললাম-
“আলহামদুলিল্লাহ!”
অনেক কথা হলো। অতঃপর এলাম আমাদের মূল আলোচনায়। যে বিষয়টি নিয়ে আজকে এতো কান্ড ঘটে গেলো ইতোমধ্যে সেই সাইকেলের বেলের বিকল্প আবিষ্কার করে ফেলেছেন জামি সায়েন্টিস। সহসা তিনি আমাকে চমকে দিয়ে বললেন-
“কাব!”
আমি থতমতো খেয়ে বললাম-
“জি-জি!”
“আমার হাতে এটা কী দেখতে পাচ্ছো?”
আমি তার হাতে একটি সুইচ, কয়েক গজ ক্যাবল আর মাইক্রোফোন অথবা মাউথপিসের মতো একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র দেখতে পেলাম। আমি নির্বিঘ্নে বলে দিলাম-
“এই তো একটা সুইচ, কিছু তার, সেই সাথে মাইক্রোফোন বা মাউথপিস জাতীয় একটা যন্ত্র।”
“সাবাস!”
“কিন্তু এগুলো তো পরিচিত জিনিস। এসব দিয়ে কী হবে?”
“হবে- হবে- হতেই হবে!”
“মানে?”
“মানে সরল। পানির মতো তরল।”
“বুঝলাম না।”
“বুঝলে না?”
“না!”
“এগুলো দিয়েই তোমার সাইকেলকে কথা বলাবো।”
“কী বলছেন!”
“ঠিকই বলছি!”
“না- না!”
“কেন নয়? অবশ্যই!”
“কিভাবে?”
“এক পলক অপেক্ষা করো। এক্ষুনি দেখাচ্ছি।”
বলে তিনি ল্যাবরেটরি ঘর থেকে একটি খুদে ক্যাসেট আর একটি ছোট টেপরেকর্ডার নিয়ে এলেন। তারপর তিনি কাজ শুরু করলেন। প্রথমে ক্যাসেটটি টেপরেকর্ডারে ভরলেন। অতঃপর আমার সাইকেলটি ভেতরে আনতে বললেন। আমি সাইকেলটি বাহির থেকে ভেতরে আনলাম। সাইকেল আনা হলে তিনি সাইকেলের হ্যান্ডেলের সাথে সুইচ শক্তমতো লাগালেন। এরপর ক্যাবল পেঁচালেন। মাইক্রোফোনটি লাগালেন সামনের দিকে। সুইচের পাশাপাশি ক্যাসেটসহ টেপরেকর্ডার লাগালেন ঠিকঠাক। স্ক্রু-ড্রাইভ দিয়ে টেপরেকর্ডার আর সুইচের সাথে সংযোগ দিলেন। একটু পর সুইচ আর মাইক্রোফেনের সংযোগ পরীক্ষা করে দেখলেন। সবকিছু জুতসই লাগানো হলে জামি সায়েন্টিস আমাকে ডাকলেন-
“কাব, এবার এসো। সুইচটা চাপ দাও।”
আমি একবুক উৎসাহ নিয়ে সুইচে চাপ দিলাম। আর দিতেই যা হলো তা নিজ কানে শুনে বিশ্বাস করতে পারলাম না। আমি সুইচে হাত লাগাতেই মাইক্রোফোন থেকে ভেসে এলো একটি কণ্ঠস্বর। যেটা বললো-
Please, আমাকে side দিন!”
আমি উদ্দীপিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলাম-
“কিভাবে সম্ভব হলো?”
জামি আঙ্কেল হাসতে হাসতে বললেন-
“বললাম না- সম্ভব! সম্ভব মনে করলেই সম্ভব।”
“তবু?”
“কিছুই না। তুমি তো সবই দেখলে।very simple ব্যাপার। এগুলো সবই খুব পরিচিত যন্ত্রপাতি। সবকিছুই হাতের নাগালেই পাওয়া যায়। চাই একট-আধটু গবেষণা। অর্থাৎ সামান্য বুদ্ধি খাটানো।”
“তাই?”
“হ্যাঁ, তাই। আসলে আমাদের সবার মাঝেই কমবেশি প্রতিভা আছে। একটু চিন্তা-ভাবনা করলে আমরা তা কাজে লাগিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণ করতে পারি।”
“পারি বৈকি! অবশ্যই পারি!”
উচ্ছ্বসিত হয়ে বলতে বলতে আমি একটা ডিগবাজি দিলাম।
দুুই.
বেশ কিছু দিন হলো জামি সায়েন্টিসের বাড়িতে আর যাওয়া হয় না। এর পেছনে অবশ্য একটি কারণ আছে। সেদিন সাইকেল কথা বলার পর থেকে আমি তো রীতিমতো সবার আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে গেছি। সবাই কেবল আমার কথা বলা সাইকেল দেখে অবাক হয়ে যায়। অনেকে বলাবলি করে- ‘যন্ত্র কথা বলতে পারে? তাও আবার সাইকেল! তাজ্জব ব্যাপার!’
কেউ কেউ আবার বিদ্রুপ করে বলে-
“ফুটানি! পিপীলিকার পাখা গজাইছে। উড়তে চায়!”
কথাগুলো শুনে অল্প একটু কষ্ট লাগলেও আমি কিছু মনে করি না। অন্য দিকে যারা আমার সাকেলটির প্রশংসা করে শুনতে ভালোই লাগে। আমি তাদেরও কিছু বলি না। তবে স্কুলে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু জয়কে সবকিছু কিছু খুলে বলেছি। জয় অবশ্য ওর ডাক নাম। আসল নাম জাহিদুল। পুরো নাম জাহিদুল জয়। ও ওর নামের মতো অন্যকেও যেন জয় করে ফেলে। সে জন্যই বুঝি ও আমার মন জয় করে সবকিছু জেনে নিয়েছে। তাতে অবশ্য আমার ভালোই হয়েছে। জয় আমার বন্ধু হওয়াতে স্কুলের সবাই আমার বন্ধু হয়ে গেছে। এর পুরো অবদানটা আলবাত জামি সায়েন্টিসের। তিনি সাইকেলে এমন প্রযুক্তি লাগিয়ে না দিলে হয়তো আমার এ সুদিন আসতো না। কেননা, বরাবরই আমি ছিলাম সবার উপেক্ষার পাত্র। এতোদিন কেউ আমাকে পাত্তা দিতো না। কী জানি আমি গরিব পোস্ট মাস্টারের ছেলে বলে ওরা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করতো। যাই হোক চলতি দিনগুলো আমার পরমানন্দে কেটে যাচ্ছে।
তিন.
আমাদের স্কুলের নাম- বেতিল বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়। এ স্কুলে আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। আজ স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতা উপলক্ষে নানারকম খেলার আয়োজন করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এসব খেলার মাঝে অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও আছে- ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল, ১০০ মিটার দৌড়, বস্তা দৌড়, বিস্কুট দৌড়, লৌহ বল নিক্ষেপ, জাম্প ইত্যাদি খেলা। তবে এ বছর নতুন একটা খেলা যোগ হয়েছে। সেটা হলোÑ সাইকেল রেইস। সব খেলার মধ্যে এই খেলাটা আমার মনে ধরেছিলো। তাই আমি বিনা বাক্যব্যয়ে কেবল এই খেলাটিতে নাম দিয়েছিলাম। আজ এই সাইকেল রেসে আমি অংশ নিতে যাচ্ছি। আর কিছুক্ষণ পর প্রতিযোগিতা শুরু হবে। সে জন্য আমার বুকের  ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করছে। কারণ আমি এর আগে কখনো সাইকেল রেসে অংশ নেইনি। তা ছাড়া সাইকেল চালাতে আমি ততটা পটুও নই। তাই বোধ হয় নানা রকম ভয় এসে আমাকে অবশ করে দিতে চাইছে। কিন্তু আমাকে যে ভয় পেলে চলবে না। তাই সাহস করে সাইকেলে চেপে বসলাম। ক্রীড়া শিক্ষক বাঁশি ফুঁ দিলেন। আমি অন্যান্য প্রতিযোগীদের সাথে সাইকেল চালাতে শুরু করলাম। আমার সাথে আরো পাঁচজন প্রতিযোগিতা করছে। সবাই আমাকে ছাড়িয়ে গেছে। আমি সবার পেছনে পড়ে গেছি। নাহ! কিছুতেই ওদের অতিক্রম করতে পারছি না। তবুও প্রাণপণ চেষ্টা করছি। আমার কপাল বেয়ে দর দর  করে ঘাম  ঝরছে। আমি হাঁফাতে শুরু করেছি। কিন্তু কিছুতেই ওদেরকে পেছনে ফেলতে পারছি না। হায়! আজ আমার মান-সম্মান কিছুই রইলো না।  হঠাৎ কী মনে হলো, আমি সাইকেলের সুইচে চাপ দিলাম। অমনি সাইকেল তার সদ্য প্রযুক্ত যন্ত্র দিয়ে কথা বলতে শুরু করলোÑ
“চষবধংব, আমাকে ংরফব দিন!”…… ভাগ্যিস! এর আগে আমি সাইকেলটি স্কুলে আনিনি। তাই এ স্কুলের কেউই আমার কথা বলা সাইকেলের ব্যাপারে জানতো না। কেবল আমার বন্ধু জয় আর আমার পাড়ার দু-একজন ছেলে এ ব্যাপারটি জেনেছিলো। এ জন্য আমার সাথে অংশ নেয়া অন্যান্য প্রতিযোগী সবাই অবাক হয়ে হোক আর ভয় পেয়ে হোক সাইকেলের গতি থামিয়ে  পেছনে তাকাতেই আমি ওদের  পেছনে ফেলে ফার্স্ট হলাম। হর্ষধ্বনি আর করতালিতে মুখর হয়ে উঠলো মাঠের চারপাশ। আমি লক্ষ্য করলাম দর্শকমন্ডলী হাঁ করে আমার সাইকেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, দর্শকদের আনন্দ-উৎসাহের আকর্ষণ আমি নই, আমার কথা বলা সাইকেল। বিষয়টা উপলব্ধি করতেই আমার লজ্জা করতে লাগলো। যাহোক একটু পরেই অন্যান্য প্রতিযোগিতা শেষ হলো। সব শেষে এলো ফলাফল ঘোষণার পালা। বিভিন্ন প্রতিযোগিতার প্রতিযোগীরা তাদের পারফরম্যান্স অনুযায়ী  ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড হলো। এবার বরাবরের মতো চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ইয়ার ঘোষণার পালা এলো। অথচ এখনো কাউকে ঘোষণা করা হয়নি। আশ্চর্য আমাকেও ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড কোনো কিছুই ঘোষণা করা হয়নি। ফলে আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। নিমিষে মনটা আমার খারাপ হয়ে গেলো। কিন্তু পলকে আমাদের ক্রীড়া অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সাংবাদিক ডা. সেলিম রেজা মাইক দিয়ে ঘোষণা করলেন-
“এ বছরে সাইকেল প্রতিযোগিতায় চমক দেখানোর জন্য এবং প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হওয়ার জন্য সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ‘কাব কাতাদাহকে’ চ্যাম্পিয়ন অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করছি।”
আমি ঘোষণা শোনা মাত্র আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। আমি মনে মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম-
“আলহামদুলিল্লাহ!”
সাথে সাথে আমার চোখ দিয়ে দু’ফোঁটা আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়লো। আমি জীবনে অনেক কেঁদেছি। কিন্তু আজকের কান্না সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের, ভিন্ন স্বাদের। চোখ মুছে আমি প্রধান অতিথির হাত থেকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফিটি বুকে তুলে নিলাম। সাথে সাথে সাংবাদিকরা আমার ছবি তুলতে লাগলেন। তাদের মাঝ থেকে আমার পূর্বপরিচিত সাংবাদিক রফিক মোল্লা আমার কথা বলা সাইকেল সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। ইতোমধ্যে মাইক দিয়েও ঘোষণা করে আমাকে কিছু বলার জন্য আহ্বান করা হলো। তাই আমি সাংবাদিক রফিক মোল্লা সাহেবের জিজ্ঞাসাবাদের কোনো উত্তর দেবার সময় পেলাম না। তবে আমি সকল সাংবাদিক, অতিথিবৃন্দ, ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ দর্শকদের অবগতির জন্য আমার কথা বলা সাইকেল ও জামি সায়েন্টিসের কথা বলতে লাগলাম। লক্ষ্য করলাম সবাই আমার কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। কিছুটা অবাক হচ্ছেন। সাংবাদিকরা নোট করছেন। রফিক মোল্লা বড় বড় করে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। আমি বুঝতে পারছি সবাই জামি সায়েন্টিস সম্পর্কে কৌতূহলী হচ্ছেন। দর্শকসারিতে উপস্থিত টুপি-দাড়িওয়ালা হুজুররা জামি সায়েন্টিসের জন্য দোয়া করছেন। আমি মনে মনে তাদের সাথে শরিক হয়ে দোয়া করতে লাগলাম। মনে মনে বললাম, তিনি যেন আরো নব নব আবিষ্কার দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধন করতে পারেন। আমি বুঝতে পারলাম না কতকগুলো কাজ আমি একসাথে করে ফেললাম। একেতো আমি মঞ্চে উঠে মাইকে জামি সায়েন্টিসের আবিষ্কারের কাহিনী বলে যাচ্ছি, আবার দর্শক সাড়া কেমন তা উপলব্ধি করছি। সেই সাথে জামি সায়েন্টিসের জন্য হুজুরদের সাথে দোয়া করছি।
আমি যেন নিজের মাঝে এক নতুন আমিকে খুঁজে পেলাম।… অতঃপর আমার বক্তব্য শেষে অন্যান্য প্রতিযোগীদের পুরস্কার বিতরণ শেষ হলে অনুষ্ঠানের সভাপতি বিশিষ্ট সমাজসেবক আরিফুল ইসলাম সোহেল সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে ক্রীড়া অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করলেন। সেই সাথে স্কুলের প্রধান শিক্ষক এম এ মুমিন সিরাজী আগামী এক মাসের জন্য স্কুলের গ্রীষ্মকালীন ছুটি ঘোষণা করলেন। ছুটির কথা শুনে আমার আনন্দ যেন আরো বেড়ে গেলো। আমি আনন্দে বিগলিত হয়ে মনে মনে বললাম, ‘স্কুল ৩০ দিন বন্ধ থাকবে! যাক এবার পুরো এক মাস নানাবাড়ি গিয়ে মজা করবো। র্হুরে!’
চার.
স্কুল ছুটির পর আমি নানাবাড়ি বেড়াতে এসেছি। আমার মামাতো ভাই সিয়ামের সাথে বেশ মজায় মজায় দিনগুলো কাটিয়ে দিচ্ছি। দু’জনে সারাদিন টো-টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। গাছে চড়ে পেয়ারা, আম, লিচু পেড়ে পেড়ে খাচ্ছি। আমার নানাবাড়ির বাগান হওয়ায় কেউ আমাদের কিছু বলছে না। নানাবাড়ির পেছন দিয়ে কুলু কুলু কলরোলে বয়ে যাচ্ছে যমুনা নদী। আমি ও সিয়াম সে নদীতে প্রতিদিন গোসল করি। আজও আমরা গোসল করতে এসেছি। অন্যান্য দিনের চেয়ে আজকে আমরা একটু বেশি সময় নিয়ে গোসল করছি। কারণ আজ আমরা নদীতীরে বালু দিয়ে নানা রকম ঘরবাড়ি বানাচ্ছি। আবার পায়ের ওপর বালু মেখে স্বযতেœ পা-টা বের করে আনছি। ফলে পাখির বাসার মতো নীড় তৈরি হচ্ছে। তাকে আমরা পাখির বাসা বলে মিছা-মিছি পাখি পাখি খেলছি। মনে মনে ভাবছি- এখানে সত্যি সত্যি পাখি এসে থাকবে। তারপর তারা ডিম পাড়বে। ডিমে তা দেবে। ডিম থেকে বাচ্ছা ফুটবে। আর সে বাচ্ছা নিয়ে আমরা ফুড়ুত ফুড়–ত খেলবো। কিন্তু চোখের পলকে নদীর বড় বড় ঢেউ এসে আমাদের তৈরি করা পাখির বাসা, কৃত্রিম ঘরবাড়ি, দালান-কোঠা বারবার ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। তবুও আমরা একটার পর একটা বানিয়েই চলেছি। এগুলো করে আমরা বেশ মজা পাচ্ছি। বালু দিয়ে নকল ঘর-বাড়ি তৈরি করে আমরা যেন আমাদের আগত দিনের স্বপ্ন বুনে চলেছি। তাই আমি ঘর বানাতে বানাতে সিয়ামকে জিজ্ঞেস করলাম-
“সিয়াম তুই বড় হয়ে কি হতে চাস রে?”
সিয়াম জবাব দিলো-
“তেমন কিছু ভাবিনি। তবে আমার জেলে হতে খুব ইচ্ছে করে।”
“বলিস কী! কেন?”
“জেলেরা সবসময় পানিতে থাকে। পানিতে থেকে হরেক রকম মাছ ধরে। আমারও পানিতে থাকতে ভাললাগে। পানিতে নেমে সারাদিন মাছ ধরতে ইচ্ছে করে।”
“তাই নাকি! তবে লেখাপড়া শিখে কী করবি? লেখাপড়া শিখে কী কেউ জেলে হয়?”
“না-না ঠিক তা নয়। আসলে আমি হতে চাই জেলেদের মতো স্বাধীনচেতা। জেলেদের মতো স্বাধীনভাবে নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে নদীর সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। মাছের সাথে কথা বলতে চাই।”
“ও আচ্ছা!”
“কিন্তু তুই তো বল তুই কী হতে চাস?”
“আমি? আমি হতে চাই ইঞ্জিনিয়ার। সাইকেল ইঞ্জিনিয়ার।”
“কী বললি? ইঞ্জিনিয়ার? তাও আবার সাইকেল ইঞ্জিনিয়ার! হাসালি….. হাঃ হাঃ হাঃ!
“এতে আবার হাসির কী হলো? সাইকেল ইঞ্জিনিয়ার কি খারাপ?”
“না খারাপ না। কোনো কাজই ছোট নয়। কিন্তু এগুলো তো মেকারি কাজ।”
“আরে না মেকারি না, তুই আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারছিস না। তাই এমন ভাবছিস।”
“ঠিক আছে, তুই বল আসল ব্যাপারখানা কী?”
“এই ধর-আমি যা বলতে চাইছি তা হলো- আমি সাইকেলকে আরো আধুনিক করতে চাই।”
“যেমন……?”
“যেমন ধর- সাইকেল নিজে কথা বলবে। যে রকম আমারটা বলে…..”
“বলিস কী! সত্যি?”
সিয়াম অবাক হলো। আমিও সিয়ামের অবাক বনে যাওয়া দেখে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলে আমার সাইকেলের প্রসঙ্গ টেনে বলতে থাকলাম-
“হ্যাঁ, সত্যি বলে। শুধু তাই নয়, আমি কিছু দিন ধরে ভাবছি সাইকেল নিয়ে যদি আকাশে উড়া যেত তাহলে খুব মজা হতো!”
“তাজ্জব ব্যাপার?”
“তাজ্জবের দেখছিস কী? কেবল শুরু!”
“শুরু?”
“হ্যাঁ বাছা, কেবল শুরু। চল আজকেই আমাদের বাড়ি যাই। আমার কথা বলা সাইকেলটা দেখে  আসবি।”
বলে তৎক্ষণাৎ আমরা নদীতে ঝুপঝাপ গোসল সেরে দ্রুত নানা বাড়ি ফিরলাম। তারপর ঝটপট দুপুরের খাওয়াটা সেরে মামা-মামীকে বলে সিয়ামকে সাথে নিয়ে ট্রেন যোগে আমাদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলাম।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)
এই অপমান কোনভাবেই সহ্য করা যাবে না। আম্মুটাও কি রকম হয়ে গেল। আব্বু যখন আমাকে বলছিলো ল্যাপটপ কিনে দেবে তখন সেওতো পাশে ছিলো। আর আজকে বলছে, এতো তাড়াহুড়া করার কী দরকার। আমি আবার তাড়াহুড়া করলাম কই। আমাকে বলেছে এ প্লাস পেলে ল্যাপটপ কিনে দেবে। আমিতো এ প্লাস পেয়েছি। আর, ল্যাপটপের কথাতো আমি বলিনি, আব্বু নিজেই বলেছেন। এখন আবার বলছেন, ব্যবসার অবস্থা ভালো না। তখন তো আর আমাকে বলেন নাই ব্যবসার অবস্থা ভালো হলে তোমাকে ল্যাপটপ কিনে দেবো। তাহলে তো আমি এতো স্বপ্ন দেখতাম না। রহিম ভাইকে বলে রেখেছি গেমস ডাউনলোড করে দেওয়ার জন্য। ফাইয়াজও আমাকে বলেছে, ল্যাপটপ কিনলে দুটো গেমসের সিডি গিফট্ করবে। রিক্সায় বসে ভাবছিল জামান।
‘এই যে ভাইজান, কার সাথে কথা কন, কোনখানে নামবেন?’ রিক্সা ড্রাইভারের কথা শুনে সম্বিত ফিরে পেল জামান। সেতো নিজেই জানে না কোথায় যাবে। ভাই, আপনার যেখানে খুশি নিয়ে যান, তবে উত্তরায় যাবেন না, ঐখানে আব্বুর দোকান।
ড্রাইভার কিছু বলতে চাচ্ছিল এমন সময় তার ফোন বেজে উঠল। ফোনের ওপাশের কথাগুলো বুঝা না গেলেও ড্রাইভার বলল, ট্যাহার মিল করতে পারলে আনবো, তয় আইজকা আর ওষুধ আননের পারবো না।
ফোন রেখে রিক্সার ড্রাইভার বলল, ভাইজান, বড় বিপদে আছি। যা আয়রোজগার হয় বাপজানের ওষুধ কিনেই শেষ। এখন আবার বলছে বাপের লাইগা একখান কম্বল নেওনের লাইগা। ঠান্ডায় নাকি বেমার আরও বাড়তাছে। দুইশো ট্যাহার নিছেতো আর কম্বল পাওন যাইবো না। ভাইজান এইখানে নামবেন?
হ্যাঁ, এইখানেই দিয়ে দেন। জামান রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া দিতে যাবে এমন সময় তার মনে পড়ল, বাসা থেকে রাগ করে বের হওয়ার সময় মানিব্যাগ নিয়ে আসেনি। সে কাঁচুমাচু হয়ে ড্রাইভারকে সে কথা বলল, এবং তার হাতের ঘড়িটি খুলে দিল। ঘড়িটি হাতে না নিয়ে ড্রাইভার বলল, এইডা কী করেন ভাইজান। আপনের বিপদের সময় কী আমি আপনের ঘড়ি নিব, আইজকা নাই তো কী অইছে, যেইদিন থাকবে দিয়া দেবেন। আর আমারে না পাইলে কোন গরিবরে দিয়া দিয়েন। এই কথা বলেই রিক্সা নিয়ে সে চলে গেল।
রিক্সা থেকে নেমেই জামান বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। বাড়ি থেকে রাগ করে আসাটা কী তার ভুল হয়েছে? না! যেখানে আমার কোন মূল্যায়ন নেই সে বাড়িতে আর কখনও ফিরে যাবো না। সে রাস্তার পাশে একটি পিলারে হেলান দিয়ে বসে এসব চিন্তা করছিল। হঠাৎ পাশের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান শুনে চিন্তার জগৎ থেকে ফিরে এলো জামান। লোকজনকে মসজিদের দিকে যেতে দেখে সেও মসজিদে গেল। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে সে হাঁটা শুর করল। কোথায় যাবে সে তা জানে না। তবে বাড়িতে সে কোনভাবেই যাবে না।
কিছুক্ষণ হাঁটার পর তার প্রচন্ড ক্ষিধে পেল। তখন মনে মনে নিজের ওপর খুব রাগ হলো। কেন সে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় মানিব্যাগ নিয়ে আসেনি। নাহলে তো তার এতক্ষণ না খেয়ে থাকতে হতো না। বেচারা রিক্সা ড্রাইভারকেও ভাড়াটা দিতে পারল না।
পাশে একটা চায়ের টঙের দোকান দেখে পানি খাওয়ার জন্য গেল জামান। গিয়ে দেখে তার মতো একটা ছেলে চা বিক্রি করছে। নিজ হাতেই একগ্লাস পানি খেয়ে দোকানের টুলে বসে পড়ল সে। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর দোকানদার ছেলেটি বলল, ভাইজান কিছু লাগবে? সেই সকালে নাস্তা খেয়ে এসেছিল জামান। এতক্ষণ কোনরকমে পেটের ক্ষুধা সহ্য করলেও এবার আর পারল না। সে দোকানদার ছেলেটিকে তার সারাদিনের ঘটনা খুলে বলল।
আরে ভাই, টাকা নাই তো কী হইছে? পেটে ক্ষুধা লাগছে খান। সে দু’টা বন ও এককাপ চা তুলে দিল জামানের হাতে। চা খেয়ে জামান ছেলেটিকে পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করলো। ছেলেটি তখন বিষন্ন মনে বলতে লাগলো, হ ভাই ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিলাম। ভাইজান জানেন, আমি কিন্তু ক্লাসে দুই নাম্বার ছিলাম। এক নাম্বার হইতাম কিন্তু যে এক নাম্বার হইছে তার বাবা স্কুল কমিটির সদস্য। তাই স্যাররা তাকে মার্ক বেশি দিতেন। স্কুল থেকে আমিই কিন্তু একমাত্র বৃত্তি পেয়েছিলাম।
তাইলে তুমি পড়াশোনা বন্ধ করে দিলে কেন?
পড়াশোনা কী আর ইচ্ছে করে বন্ধ করে দিছি ভাইজান। হঠাৎ করেই কারখানা থেকে খবর এলো, বাপজান মারা গেছেন। বিশ্বাস করেন ভাইজান আমার বাপ খুব ভালো মানুষ ছিল। তারা তাদের স্বার্থের জন্য আমার বাপরে মেরে ফেলেছে। বাপজান মারা যাওয়ার কষ্ট সহ্য করতে না পেরে আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়ল। এখন আর আমার মা কথা বলতে পারে না। সেই থেকেই আমার পড়াশোনা বন্ধ। স্কুলের এক স্যারের সহযোগিতায় এই টঙটা দিছি। এখন কোন রকমে আমাদের মা-ছেলের দিন চলে যাচ্ছে। ডাক্তার বলছে অপারেশন করা না হলে মা নাকি আর সুস্থ হবে না। তবে অনেক টাকা লাগবে। এই দুই বছরে আমি কিছু টাকা জমিয়েছি। আরও কিছু টাকা জমা হলে ডাক্তারের কাছে যাবো। বেশ চিন্তায় আছি ভাই। ইদানীং বেশি টাকা পয়সা জমা করতে পারি না। জিনিসপত্রের দামও বাড়ছে।
ছেলেটার কথা মুগ্ধ হয়ে শুনলো জামান। মনে মনে ভাবলো, আমি আব্বা আম্মার ওপর রাগ করে এসেছি আর ওই ছোট্ট ছেলেটি তার মায়ের জন্য কত কিছুই না করছে। না! আব্বার ওপর এভাবে রাগ করে আসাটা আমার উচিত হয়নি। বাবার কষ্টমাখা চেহারাটা মনে পড়ে গেল জামানের। সে বাড়িতে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলো।
ঐ  মেয়েটার নাম রুমি। পুরো নাম রোমানা শিরিন রুমি। ক্লাস ফাইভে পড়ে। পাঠান পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। রুমির ক্লাসে ৫০ জন ছাত্রছাত্রী। ওর রোল নম্বর ৩। রুমি মধ্যম গড়নের মেয়ে। আকাশের চাঁদের মতো চেহারা। বয়স ৯ হলেও কথাবার্তায় মনে হয় আশি বছরের বুড়ি। তার পাকনা কথা শুনলে সবাই অবাক হয়। বিশ্বাসই করতে চায় না যে তার বয়স ৯। এই কয় দিন আগেও রুমি এমন ছিলো না। একদম ছিলো শান্ত এবং সহজ সরল। তার কম কথা বলা নিয়ে বাবা-মা টেনশন করতেন। এখন মেয়ের মুখে কথার খই ফুটতে দেখে তারা খুশি। রুমির কথা- ওতো আগের মতো আর ছোট্ট বাচ্চা নয়। যে টিকটিকি দেখে কান্না জুড়ে দেবে। বিড়াল দেখে আঁতকে উঠবে। আসলে মা-বাবার কাছে সন্তান কখনো বড় হয় না। অনার্স পড়ুয়া সন্তানকেও খোকাখুকি মনে হয়। তবু তাদের ধারণা নতুন প্রাইভটে টিচারের দক্ষতায় সব হচ্ছে। রুমি ২০ নম্বর রোল থেকে তিনে এসেছে। তাই টিচারের প্রতি তারা সন্তুষ্ট। রুমির টিচারের নাম আহসান। আসলেই তিনি যোগ্য মানুষ। ছেলেমেয়েদেরকে তার মতো গড়তে চেষ্টা করেন।
আজ মন ভালো নেই রুমির। জানালার ধারে বসে আছে। গ্রিল ধরে তাকিয়ে আছে ছোট্ট বাগানটার দিকে। এক মনে ভাবছে বাগানটার কথা। বাগানটা তার ভীষণ প্রিয়। নিয়মিত বাগানের গাছে পানি দেয় সে। গাছে ফুল ফুটলে তার আনন্দ আর দেখে কে? ছোট্ট বাগানে ঘুরে বেড়ায়। ফুলগুলোকে আদর করে। তাদের কানে কানে কবিতা আবৃত্তি করে। রঙিন ডানার প্রজাপতি ঘুরে বেড়ায়। টুনটুনি, দোয়েল, শালিক, ঘুঘুরও দেখা মেলে। সবার আগমনে রুমি খুব খুশি। মনে হয় তার মতো সুখী পৃথিবীতে দুটো নাই। রুমির ধারণা যারা ফুল ছিঁড়ে, গাছ কাটে তারা ভালো মানুষ নয়। তার বাবা আবদুল মোনায়েমও নয়। এই যে কাল রাতে বাবা বললেন সব গাছ কাটবেন। বাড়ি সংস্কার করবেন। শুনে তার মন খারাপ হয়। এ জন্যই আজ মন ভালো নয়। স্কুলেও যায়নি। মা শরীর খারাপ ভেবে কিছু বলেননি।
বিকেলে আহসান স্যার এলেন। রুমি পড়তে বসলো। পড়ায় একটুও মন বসছিলো না। বিষয়টা স্যারের নজর এড়ালো না। তিনি নরম সুরে বললেন, কী হয়েছে রুমি? মন খারাপ কেন? কী ব্যাপার বলো তো? গাছ …গা…ছ… আমতা আমতা করছে রুমি। কাঁপা কাঁপা গলায় বললো বাবা সব গাছ কাটবেন…। এতোটুকু বলেই ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠলো রুমি। তার চোখে জলের ঢেউ দেখে স্যার বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কান্নার আওয়াজ শুনে ঘরে আসেন তার মা। ভেবেছে স্যার মেরেছে। স্যার তাকে অভয় দিয়ে বললেন, চিন্তা করো না। আমি তোমার আব্বুকে ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবো। তিনি অবশ্যই আমার কথা রাখবেন। গাছ আর কাটবেন না। সুস্থ জীবনের জন্য। সুন্দর পরিবেশের জন্য।
রুমি ছোট থেকেই অন্য রকম। প্রকৃতি-পাগল। ও কান্নার সময় যদি পাখি ডাকতো কান্না থামিয়ে দিতো। মুগ্ধ হয়ে শুনতো তার গলা। এক দিনের ঘটনা, রুমি তার মায়ের সাথে নানাবাড়ি যাচ্ছিলো। কাছেই তার নানাবাড়ি। এ বাড়ি আর ও বাড়ি এই রকম দূরত্ব। হঠাৎ তার নানার দেখা হলে আলাপ শুরু করেন তার মা। রুমি হাত ছাড়া পেয়ে একটু পিছিয়ে যায়। হাঁটতে হাঁটতে পুকুরপাড়ে পৌঁছে। পুকুরের শাপলা ফুল তুলতে নামে। পা পিছলে সামান্য পানিতে পড়ে। একাই ওঠে। ফুল ছিঁড়ে ভেজা শরীরে ফিরে আসে। তাকে কাকভেজা অবস্থায় দেখে মা ও নানা দুইজনইে অবাক হন। কথায় মগ্ন হওয়ায় তারা এতোটা খেয়াল করেনি। তার হাতে ফুল দেখে কারো বুঝতে অসুবিধা হলো না যে সে পুকুরে গিয়েছিলো। ডান পায়ের জুতা না থাকাটাই সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ। পরে তার নানা পুকুরের মাঝখান থেকে জুতাটা তুলে দেন। এবং মেয়েকে সাবধানে রাখতে বলেন। ঐ ঘটনার পর থেকে তার মা রুমিকে চোখে চোখে রাখেন। একা কোথাও যেতে দেন না। বাইরে না যেতে পারাটাই তাকে বাগানের দিকে ঝুঁকে দিয়েছে আরো। আর বাবা সেই বাগান রাখতে চান না। এটা কি মানা যায়?
রুমি জানে না স্যার তার বাবাকে ব্যাপারটা বুঝিয়েছেন কি না। তাই রাতে আস্তে আস্তে বাবার কাছে গেলো। কিভাবে শুরু করবে ভাবছে। তাকে নীরব দেখে তার বাবাই আগে বললেন, কিরে রুমি কিছু বলবি? হ্যাঁ বাবা। তা চুপ করে আছিস কেন বল না? তুমি গাছ কেটো না বাবা। দুর পাগলি! বাগানে সাপ, বিচ্চু, ভূত-টুত আসবে। কোন সময়ে কার কি ক্ষতি করে বলা যায় না। ঐ পরশু দিন এক লোকের মৃত্যুর কথা শুনোনি! ও সাপের কামড়েই মরেছে। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাগান কেটে বাড়ি সংস্কার করবো।
রুমির আগেই মনে হয়েছিলো তার বাবা নিষ্ঠুর। সিদ্ধান্ত বদলাবেন না। আর এখন সরাসরি কথাটা শুনে কান্নায় ভেঙে পড়লো। তার কান্না দেখে বাবা- মা দুইজনেই অবাক। তার মায়ের মনে হলো ও তখন স্যারের কাছে এ জন্যই বুঝি কেঁদেছে। কি যেন গাছের কথা বলছিলেন স্যার। ভালো করে শুনেননি তখন। এখন রুমির মুখে আবার কথাটা শুনে ব্যাপারটা বুঝলেন। মেয়ের বাগানপ্রীতি দেখে তার মনটা নরম হলো। মেয়ের পক্ষ নিয়ে তিনি বললেন কি দরকার আছে গাছ কাটার? রুমি যখন এতো করে বলছে বাগানটা থাক না! আবদুল মোনায়েম সাহেব প্রথমে রুমির কান্না পরে তার মায়ের কথায় একটু অন্যমনস্ক হলেন। খানিক ভেবে বললেন, ঠিক আছে কাটবো না এক শর্তে। কী শর্ত জানতে চাইলো রুমির আম্মু। মোনায়েম সাহেব এবার মেয়েকে কাছে টেনে তার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বললেন, তুমি বাগানে বেশি যাবে না। আর রাতে তো ভুলেও যাবে না ঠিক আছে? হু। মাথা নেড়ে রুমি বাবার বুকে মুখ লুকালো …।
-‘এই সোহান, বিকেল বেলায় ঘুমাচ্ছিস কেন? পাখি শিকার করতে যাবি না?’
জানালার কাছ থেকে কে যেন জোর গলায় সোহানকে ডাক দিল। আচমকায় ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠে তাকিয়ে দেখে তার বন্ধু আরিফ।
-‘একটু দাঁড়া, আমি গুলতিটা সঙ্গে নিয়ে আসছি।’
চারদিকে শীতের কনকনে ঠান্ডা বাতাসের ভেতর জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে কংস নদীর ধারে দুই বন্ধু চলে আসে। চোখধাঁধানো এমন সুন্দর প্রকৃতির বুকে হাজার পাখির কলরবে মুখরিত এই কংস নদীকে খুব ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে সোহান। হিমেল ঠান্ডা বাতাসে তার এলো চুলগুলো কাশফুলের মত দোলছে। হরেক পাখির এপাশ থেকে ওপাশে উড়া দেখে আরিফের গলা বেজে ওঠে-‘কিরে, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? গুলতিটা বের করে আমার মতো দু-একটাকে লাগা।’
কথাটা শুনার সাথে সাথেই সোহান তার গুলতিটাকে বের করে। তারপর শক্ত পাথরের টুকরোগুলো গুলতির মাথায় ধরে সোজা কতক পাখির ভিড়ের মধ্যে ছুড়ে মারতে থাকে। একবার এক ঝাঁক পাখির ভেতর থেকে একটা পাখি ছিটকে মাটিতে পড়ে যায়। আনন্দে সোহানের সুখ যেন আর ধরে না! দৌড়ে পাখিটাকে ধরে একটা পিঞ্জিরার ভেতর আটকে রাখে সে। সন্ধ্যার আগে সোহান আর আরিফ মিলে সাতটা পাখি শিকার করে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।
বিকেলের ছিটেফোঁটা একটু ঘুমের জন্য কোনভাবেই রাতে তার ঘুম আসছিল না আরিফের। তবুও বিছানায় শুয়ে শুয়ে নানান কথা ভাবতে লাগলো সে। পাখি শিকারের চিন্তায় হঠাৎ সে কাউকে কিছু না বলে নদীর ধারে চলে গেল। গুলতিটাকে তাক করে একটা মা পাখিকে সে মারতে যাবে এমন সময় তার পায়ের কাছে ছোট্ট একটা পাখির ছানা আস্তে করে খোঁচা দিল।
-‘আমার মাকে তুমি মেরে ফেলেছো কেন? তুমি একটা খুনি, অপরাধী, দুষ্টু ছেলে।’
কথাটা শুনার সাথে সাথেই বেশ চমকে উঠল সোহান। ‘ছোট্ট পাখির ছানাটা দেখি মানুষের মত কথা বলতে পারে!’ একটু হকচকিয়ে উঠে ছানাটাকে জিজ্ঞাসা করে সে-
-‘এই যে ছানা, তোমার মাকে আবার আমি কবে মারলাম?’
-‘কেন, ভুলে গেছো নাকি! কালকে আমার মা যখন আমাকে নিয়ে আকাশে উড়াল শিখাচ্ছিল তখন তুমিইতো আমার মাকে গুলতি দিয়ে মেরেছিলে। এখনও কি মনে পড়ছে না?’
-‘ও এই কথা, মেরেছি তো কি হয়েছে?’
-‘কি আবার হবে! তোমার তো মা বেঁচে আছে। যদি না বেঁচে থাকতো না তবে বুঝতে মা ছাড়া কেমন লাগে। আর কোনদিনই তোমাদের এই নদীতে বেড়াতে আসবো না।’
পাহাড়ের মতো হাজারো জমানো দুঃখগুলোকে বুকের ভেতরটায় আটকে ধরে দুচোখের জল মুছতে মুছতে ছোট্ট ছানাটা একা একাই আকাশের দিকে উড়াল দিল।
সোহানও তখন পেছন থেকে অনেকবার করে ছোট পাখিটাকে ডাক দিল। কিন্তু ছানাটা আর ফিরে তাকাল না!
হঠাৎ কে যেন সোহানকে ডাকছে। চোখ খোলে তাকিয়ে দেখে তার মা।
-‘সকাল হয়ে গেছে, আর কত ঘুমাবি এবার উঠ্’।
হতভম্ব হয়ে কিছুক্ষণ দুচোখ কচলাতে কচলাতে সবকিছু বুঝতে পারে সোহান। তার মানে এতক্ষণ সে একটা স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু সেই ছোট্ট পাখিটার জন্য যে সে কাঁদতে কাঁদতে তার বালিশটা ভিজিয়ে ফেলেছে এটা তো একদম-ই বাস্তব।
বিছানার পাশেই গুলতিটাকে নিয়ে নদীর পাড়ে দৌড়ে ছুটে যায় সোহান। তারপর সোজা পানির ভেতর সেটাকে ছুড়ে মেরে মনে মনে শপথ করতে থাকে আর কোনদিন একটা পাখিকেও সে শিকার করবে না। এমনকি অন্য কাউকে করতেও দেবে না।
নিঝুম রাত্রি। অর্ধেক চাঁদ আকাশে পাহারা দিচ্ছে। চারিদিকে কেউ নেই। নেই কোন মানুষ। শুধু চারপাশে শুনা যাচ্ছে রাতের কত কীটপতঙ্গের শব্দ। ভীষণ উত্তেজনায় হেঁটে যাচ্ছে মাহমুদ। একা জনশূন্য রাস্তায় মাহমুদেরও ভয় লাগছে বেশ। তবুও হেঁটে যাচ্ছে সে অনেক ধর্মভীরু ও সাহসী ছেলে তারপরও কেন জানি আজ তার ভীষণ ভয় লাগছে। কোথায় যাচ্ছে তা সে জানে না। শুধু হেঁটেই যাচ্ছে, এতটুকু জীবনে অনেক কিছু দেখা হয়ে গেছে তার। এই তো দুই বছর হলো তার বাবার এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া। এরপর ভীষণ একা হয়ে পড়ে সে। মৃত্যুর আগে তার বাবা অনেক আগ্রহ করে তার বড় ভাই সাদকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করিয়েছিলেন। রেজাল্ট আর দেখা হলো না উনার। এর কিছুদিন পর রেজাল্ট দেখা গেল সাদ চান্স পেয়েছে। বাবার মৃত্যু, অনেক জটিলতা ইত্যাদির মধ্যেও সে যে চান্স পেয়ে গেছে তাই সবাই এর জন্য অনেক খুশি। কিন্তু এর সাথে সাথে পড়ার খরচ ও ভাইয়ের ঢাকা যাওয়ার চিন্তায় আবার আশাহত হয়ে পড়েন সবাই। তারপরও মহান আল্লাহর মেহেরবানিতে ভাইয়ের এক বন্ধু ফোনে খবর শুনে তাকে তার ঢাকার বাসায় থাকার প্রস্তাব দিল। এবং সাথে কোন ধরনের চিন্তা না করারও আশ্বাস দেন। ঢাকায় একটা পার্ট টাইম জবেরও ব্যবস্থা করে দেন। ভাইয়ার বন্ধু হলেন ঢাকায় স্থায়ী নিবাসী। একবার ওদের জেলায় বেড়াতে এসে সাদ ভাইয়ার সাথে দেখা। সেই থেকে গভীর বন্ধুত্ব। মাহমুদ অনেক মিশুক স্বভাবের হলেও ওর আবার বন্ধুত্ব বিষয়টা অতটা ভালো লাগত না। কিন্তু সে দিন সে বুঝতে পারলো জীবনে বন্ধু থাকা কতটা প্রয়োজন। ওদের আম্মু আবার সেলাইয়ের কাজ জানেন এবং সেলাই মেশিনও আছে। এর ওপর সে কয়দিন অর্ডার আসছিল বেশ। তাই ঢাকা যাওয়ার খরচও অনায়াসে হয়ে গেল। মা ও মাহমুদ মিলে চোখের জলে ভিজিয়ে বিদায় জানালেন সাদকে। এরপর মাহমুদ আরো একা হয়ে পড়লো।
বাবার কথা এমনিতে মনে পড়তো তবে সে কয়দিন আরো বেশি মনে পড়তে লাগল। তার উৎসাহ, তার গল্পের সাথি, তার প্রেরণাদাতা। একা একা কিছু করতে ভালো লাগে না। কারো সাথে মিশতে, খেলতে, পড়তে ভালো লাগে না। শুধু মনের সাগরে একটি মাত্র ইচ্ছা ভেসে আসে তা হল বাবাকে আর একটি বার দেখার ইচ্ছা …. । পথ চলতে চলতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায় সে। কে যেন সামনে দাঁড়িয়ে হালকা অন্ধকারের জন্য চেহারাটা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে না। হঠাৎ লোকটি বলে উঠল – কী খবর, মাহমুদ!
মাহমুদের বাবার ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। তাই তাকে আদর করেও ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদের নামে ডাকতেন।
এতদিন পর হঠাৎ এই নাম শুনে মাহমুদ আঁতকে উঠল। এই লোক এ নাম জানলেন কি করে। এ নামে তাকে একমাত্র তার বাবাই ডাকতেন, তবে কণ্ঠটাও বেশ চেনা চেনা লাগছে ওর।
তবে কি তিনি বাবা ….
মাহমুদ কিছু বলতে যাবে, তখন লোকটি বলে উঠলেন কিরে বাবা চিনিসনি বুঝি?
তোর প্রিয় নামেই তো ডাকলাম ….
মাহমুদ: আপনি কি আমার বাবা !! না.. না .. এটা কি করে হতে পারে। এটা অসম্ভব !!
লোক : মাঝে মাঝে অসম্ভবও সম্ভব হয়ে যায় বাবা। আমিই তোর বাবা। এ কথা বলার সাথে সাথে চাঁদের হালকা আলো উনার চেহারার ওপর পড়ল।
মাহমুদ ভয়ে এক , দু’ পা পিছিয়ে গেল।
ভয় পাস নে বাবা …. উনি বলে উঠলেন। “ আমি তোর সাথে কিছু কথা বলতে এসেছি।” কণ্ঠে চলে এলো গাম্ভীর্য। আমি তোর ওপর অনেক অসন্তুষ্ট। এ কয়দিন তুই যা করছিস তা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। খাওয়া-দাওয়া, খেলা-পড়া সব বাদ দিয়ে তুই মনমরা হয়ে বসে থাকিস? তুই কি মনে করছিস তুই এসব করলে তোর বাবা অনেক খুশি হবে? না … কখনোও না। আমি তোকে নিয়ে জীবনে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু বাবা, তুই আজকাল যা করছিস তাতো আমার সব স্বপ্নের ওপর ভাটা পড়ে যাচ্ছে। মাহমুদ কি করবে না করবে বুঝতে পারছে না। লোকটির কণ্ঠ, চেহারা কথার ধরন সবকিছুই বাবার মত। লোকটি তখনও বলে যাচ্ছেন-
‘আমি নেই তো কী হয়েছে, তোমরা দুই ভাই তো আছ। তোমরা দুই ভাইতো আমার সব। আমার স্বপ্নের ডানা। তোমরাই উড়ে গিয়ে আমার স্বপ্নগুলোকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পার।
তিনি ফিরে মাহমুদের কাঁধে হাত দিলেন। তখনও বলে যাচ্ছেন, “তোমাকে সচেষ্ট হতে হবে মাহমুদ। তোমাকে অতীত ভুলে আগামীর দিকে হাত বাড়াতে হবেই। পড়ালেখা করে অনেক বড় হতে হবে। পাড়ি জমাতে হবে দিগ থেকে দিগন্তে। সে খুশিতে, আগ্রহে তার বাবার ডাকে সাড়া দেয়ার জন্য এবং তাকে আদরে জড়িয়ে ধরার জন্য এগুতেই আজানের সুমধুর ধ্বনি তার কানে যায়।
ফজরের আজান। আজানের সুর শুনতেই তার ঘুম ভেঙে যায়। হুড়মুড়িয়ে বিছানায় উঠে বসে। পরক্ষণেই বুঝতে পারে সে, সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল। মুহূর্তেই তার স্বপ্নে বাবার কথাগুলো মনে পড়ে যায়। মনের মধ্যে বাবার স্বপ্ন পূরণের সেই ওয়াদা পালনের জন্য নতুন উদ্যম আসে। মুচকি হেসে ভাবতে থাকে, ইস; স্বপ্নটা যদি সত্য হতো!! বালিশের পাশে রাখা টুপিটা হাতে নিয়ে বিছানা থেকে নেমে মাথায় দিতে দিতে নতুন উৎসাহ, নতুন উদ্যমে প্রাণবন্ত হয়ে ছুটতে থাকে মসজিদের দিকে। মুখে তখনও লেগে আছে সেই হাসি…।
ঐ তো সেদিন আমার অন্তরঙ্গ নতুন এক কবির সাথে দেখা করতে গেলাম। গিয়ে দেখি তার বইয়ের ভেতরে ভেতরে, বালিশের নিচে কিশোরকণ্ঠরা হাসছে। চা-কফির পর্ব সেরে তার সাথে বেশ আলাপ জুড়িয়ে দিলাম। আমি প্রথমে তাকে জিজ্ঞেস করলাম। কিভাবে তোমার হৃদয় মাঝে কবিত্বের উদ্ভব ঘটল?
উত্তরে অন্তরঙ্গ কবি আব্দুল্লাহিল মামুন বিন হারুন বলল, আসলে আমার হৃদয়ে কিভাবে যে কবিত্বের উদ্ভব ঘটল তা বলা কঠিন। অনেক আগ থেকেই যখন বিকেলে প্রকৃতির পরিবেশে একটু নীরব নির্জন হয়ে যায় তখন আমার মনে হতো আমি কেমন জানি এক ভিন গ্রহের লোক। আর মাঝে মাঝে অনুভব করতাম আমার কী যেন নেই, কী যেন পাওয়ার আছে। আমি কবিতা পড়তাম, ভালো লাগত। এই ভালা লাগা থেকেই লিখতে শুরু করি। তারপর মুচকি হেসে তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম- তুমি কোথা থেকে কবিতা পড়তে?
সে বললো, আমি কবিতা পড়তাম পাঠ্যবই, কিশোরকণ্ঠ এবং অন্যান্য পত্রিকা থেকে। তবে কিশোরকণ্ঠে ছড়া কবিতা, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি পড়তে খুবই ভালো লাগত। আমার এক কবিতায় আছে-
গল্পের বইয়ে গল্প থাকে
ছড়ার বইয়ে ছড়া
আমার কিশোরকণ্ঠে
সবকিছুতেই ভরা।
উপন্যাসের বইয়ে থাকে
শুধুই উপন্যাস
আমার কিশোরকণ্ঠে
সবকিছুই বসবাস
মস্ত ভাল লাগে আমার
পড়তে তোমার লেখা
তোমার থেকে অনেক কিছু
হয় যে আমার শেখা।
এরপর আমি তাকে বললাম, তুমি তো কবি। অন্য কোন কবির কাব্যে কি তুমি উঠেছ?
উত্তরে সে বলল, আসলে আমি কবি, বিষয়টা এমন নয়; আমি কবি হতে চাই। ২০১৪ সালে যখন আমি ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি তখন গ্রামের মাটির পথ দিয়ে চলতাম। প্রকৃতিকে উপভোগ করতাম আর শত শত কল্পনা মাথায় এসে ঘুরাফেরা করত। একদিন একজন সাহিত্য সাধকের সাথে দেখা হয়ে গেল। তার নাম বুলবুল ইসলাম। তিনি আমার সম্পর্কে বলছিলেন,
“লেখালেখি করে সে যে রাতে আর দিনে
কবি মামুন নামে সবে তারে চিনে।
কেউ বলে পাগল তারে, কেউ বলে কবি,
এই পাগলই একদিন
হয়ে উঠবে রবি।”
আমি তাকে বললাম, তোমার গ্রামের বাড়ি কোথায়?
সে বলল, ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও থানাধীন দক্ষিণ পাড়া গ্রামে।
দু’জনে আলাপ করতে করতে শরবত, আঙ্গুর, আপেল টেবিলে এসে জমা হলো। আমি আর কবি মামুন বিন হারুন দু-গ্লাস শরবত পান করে দুটো আপেল হাতে নিলাম। এবার তাকে শেষ প্রশ্নটা করলাম, তুমি কি কোন উপাধি পেয়েছ কখনো? যেমন চুরুলিয়া গ্রামের দুরন্ত ছেলে দুখু মিয়া পেলেন ‘বিদ্রোহী কবি’ উপাধি।
মামুন একটা হাসি দিয়ে বলল, আমি কি আর কবি-টবি নাকি? তারপরও শুনে অবাক হবে যে ছেলেরা দুষ্টুমি করে আমাকে ‘আইনস্টাইন’ বলে ডাকে।
আমরা জানি মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন বিজ্ঞানমনস্ক থাকায় বাড়ির পথ চিনতেন না। এ রকম আমিও গাজীপুর বা একটু দূর থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথ প্রায়ই ভুলে যেতাম। একা একা বাড়ি যেতে পারতাম না।
তাই সেই সূত্র ধরেই দুষ্ট ছেলেরা উপাধি দিয়েছে ‘আইনস্টাইন’।
 
কিশোরকন্ঠ-সর্বাধিক প্রচারিত শিশু-কিশোর মাসিক এখন এখানেই পড়ুন কিশোরকন্ঠ-সর্বাধিক প্রচারিত শিশু-কিশোর মাসিক এখন এখানেই পড়ুন Reviewed by MD Naim on 1:39:00 PM Rating: 5

No comments:

Leave a comment here.

Powered by Blogger.